ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে; সভাপতিত্ব করছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। রবিবার (৭ জুন) বিকাল ৩টায় এই অধিবেশন শুরু হয়। এটি নতুন সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন। যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী সংসদ নেতা তারেক রহমান এবং মন্ত্রী এবং সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা। আছেন বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমান ও এমপিরা।
অধিবেশন শুরুতেই স্পিকার বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের কারণে এবারের অধিবেশন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
“সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ কীভাবে দেশের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণে যথাযথভাবে ব্যয় হবে, তার একটি সুস্পষ্ট নীতিগত ও আর্থিক দিকনির্দেশনা এই অধিবেশনের মাধ্যমে জাতির সামনে উপস্থাপিত হবে।”
প্রথম দিনের কার্যসূচিতে রয়েছে সাম্প্রতিক জ্বালানি পরিস্থিতি মোকাবিলায় গঠিত বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপন।
কার্যসূচি অনুযায়ী, সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন ও শোকপ্রস্তাব গ্রহণের পর প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। এদিন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য নির্ধারিত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হবে।
জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ সংক্রান্ত কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ বিধির আওতায় জমা পড়া নোটিশও নিষ্পত্তি করা হবে।
এরপর কার্যপ্রণালী বিধির ২১১(১) অনুযায়ী ‘সাম্প্রতিক জ্বালানি নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় করণীয় সম্পর্কে গঠিত বিশেষ কমিটি’র প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন কমিটির সভাপতি ও সিরাজগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ।
বাজেট অধিবেশনের গুরুত্ব তুলে ধরে স্পিকার বলেন, সংবিধানের ৮৭(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতি অর্থবছরের জন্য সরকারের অনুমিত আয় ও ব্যয়ের সমন্বিত বিবৃতি বা বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করতে হয়।
তিনি বলেন, সংবিধানের ৮৮, ৯০, ৯১ ও ৯২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায়যুক্ত ব্যয়, নির্দিষ্টকরণ আইন, সম্পূরক ও অতিরিক্ত ব্যয় এবং হিসাব-সংক্রান্ত বিষয়ে সংসদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
“ফলে বাজেট অধিবেশন শুধু আর্থিক পরিকল্পনা অনুমোদনের ক্ষেত্র নয়, বরং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”
জাতীয় সংসদকে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করে স্পিকার বলেন, বাজেট সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান নীতিগত ও আর্থিক দলিল।
“তাই এই অধিবেশনে আপনাদের দায়িত্বশীল, তথ্যনির্ভর ও গঠনমূলক অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
সরকারি ও বিরোধী দল নির্বিশেষে সব সংসদ সদস্য জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দায়িত্বশীল আলোচনা ও মূল্যবান মতামত উপস্থাপন করবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
স্পিকার বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে ভিন্নমত ও মতপার্থক্য থাকবে। তবে সেই আলোচনা যেন শিষ্টাচার, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সংসদীয় রীতিনীতি ও আচরণবিধির আলোকে পরিচালিত হয়, সে বিষয়ে আমি আপনাদের সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।
সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনায় নিজের “সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতার অঙ্গীকার” পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “সংসদীয় গণতন্ত্রের চেতনা অনুযায়ী দায়িত্বশীল আলোচনা, গঠনমূলক সমালোচনা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মধ্য দিয়ে একটি কার্যকর ও জনমুখী বাজেট প্রণয়ন সম্ভব।”
বাজেট ঘোষণা বৃহস্পতিবার
এই অধিবেশনের প্রধান আলোচ্য বিষয় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। আগামী ১১ জুন অর্থমন্ত্রী নতুন অর্থবছরের বাজেট সংসদে উপস্থাপন করবেন।
আগামী অর্থবছরের বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে বাজেটের আকার বাড়ছে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।
সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে নতুন বাজেটের অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে দেশে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরির প্রেক্ষাপটে গত ২৬ এপ্রিল সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে ১০ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেছিলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণ করে সংসদে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দেবে এই কমিটি।
গত ৩ মে কমিটির প্রথম বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে একটি উপস্থাপনা দেয়।
সেখানে মন্ত্রণালয় জানায়, ইরান যুদ্ধকে ঘিরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতার সঙ্গে বাজারে আতঙ্ক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা পূরণের মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা না থাকায় আমদানি ব্যাহত হলেই সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল অনিয়মিত হয়ে পড়ায় সরবরাহ ব্যবস্থাও চাপে পড়ে।
ওই বৈঠকের পর জ্বালানি আমদানি নিরবচ্ছিন্ন রাখার সুপারিশ করেছিল বিশেষ কমিটি। পরবর্তী বৈঠকগুলোতে সদস্যদের মতামত ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করা হয়।








































আপনার মতামত লিখুন :