চুয়াডাঙ্গার দর্শনা পৌরসভায় ভিজিএফের চাল বিতরণে তালিকা জটিলতা ও অস্বচ্ছতায় প্রকৃত অসহায়রা বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে পৌরসভার ৩, ৪ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডে প্রকৃত দরিদ্র, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা ও অসহায় অনেক মানুষ তালিকায় নাম না থাকায় চাল না পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে গেছেন। অন্যদিকে কিছু স্বচ্ছল ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীরাও ভিজিএফের চাল পেয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠায় এলাকায় সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, দর্শনা পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের উপকারভোগীদের জন্য কার্ডপ্রতি ১০ কেজি করে ভিজিএফের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী ১ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৩৫ জনের জন্য ৩ হাজার ৩৫০ কেজি, ২ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৯০ জনের জন্য ৩ হাজার ৯০০ কেজি, ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৩৫ জনের জন্য ৩ হাজার ৩৫০ কেজি, ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৩৩ জনের জন্য ৩ হাজার ৩৩০ কেজি, ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৪২ জনের জন্য ৩ হাজার ৪২০ কেজি, ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৪২ জনের জন্য ৩ হাজার ৪২০ কেজি, ৭ নম্বর ওয়ার্ডে ২৮৩ জনের জন্য ২ হাজার ৮৩০ কেজি, ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৯৭ জনের জন্য ৩ হাজার ৯৭০ কেজি এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ৩২৮ জনের জন্য ৩ হাজার ২৮০ কেজি চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ৯টি ওয়ার্ডে মোট ৩ হাজার ৮৫ জন উপকারভোগীর জন্য ৩০ হাজার ৮৫০ কেজি চাল বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে বুধবার (১১ মার্চ) সকাল থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত পৌরসভার ৩, ৪ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডে ভিজিএফের চাল বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
চাল বিতরণের সময় দেখা যায়, তালিকায় নাম না থাকায় অনেক অসহায় মানুষ চাল পাননি। ভুক্তভোগীদের মধ্যে অনেকে বয়োবৃদ্ধ, কেউ বিধবা, কেউ স্বামী পরিত্যক্তা। আবার কেউ এমন আছেন যারা চলাফেরা করতে পারেন না বা ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে জীবনযাপন করেন। অথচ তারাই এই সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। চাল নিতে এসে তালিকায় নাম না পেয়ে অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও অসহায় নারী চোখের পানি ফেলতে ফেলতে ফিরে যান।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে ইসারন নেছা নামে এক বৃদ্ধা বলেন, আমার কেউ নেই। এখন পর্যন্ত তেল কেন, চালের কার্ডও পাইনি। এ কথা বলতে বলতে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
আরেক ভুক্তভোগী বৃদ্ধা বলেন, আমাদের দুনিয়ায় কেউ নেই। ছেলে নেই, মেয়ে নেই, স্বামী নেই। কাজ করার শক্তিও নেই। তাহলে আমরা কেন এই চাল থেকে বঞ্চিত হবো?
নিয়াজ উদ্দিন নামে এক ভ্যানচালক বলেন, আমি ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। আমিও কোনো কার্ড পাইনি।
চাল বিতরণের সময় বিভিন্ন অনিয়মও দেখা গেছে। জানা গেছে, এক নারী একাই ১৭ জনের টোকেন বা কার্ড নিয়ে ভিজিএফের চাল নিতে আসেন। বিষয়টি দর্শনা পৌরসভার প্রধান সহকারী শাহ আলমের নজরে এলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে টোকেনগুলো জব্দ করেন এবং টোকেনের প্রকৃত মালিকদের কাছে তা হস্তান্তর করা হয়। এছাড়াও অভিযোগ উঠেছে, কিছু সচ্ছল ব্যক্তি এই ভিজিএফের চাল পেয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, কেরু অ্যান্ড কোম্পানিতে চাকরি করেন এমন কয়েকজন এবং বাজারে কাপড়ের ব্যবসা করেন এমন কয়েকজনও এই চাল পেয়েছেন। অথচ প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় মানুষের নাম তালিকায় না থাকায় তারা চাল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের অনেকেই মনে করেন, পৌর কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকলেও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মাধ্যমে তালিকা প্রস্তুতের কারণে প্রকৃত উপকারভোগীদের অনেকেই বাদ পড়েছেন। তাদের মতে, আগের মতো পৌর কর্তৃপক্ষ যদি সরাসরি তালিকা প্রস্তুত করতো, তাহলে হয়তো এ ধরনের জটিলতা ও বিতর্ক তৈরি হতো না।
পৌরসভার প্রধান সহকারী শাহ আলম বলেন, চাল বিতরণে কোনো অনিয়ম হয়নি। তবে এক নারী একাই ১৭ জনের কার্ড নিয়ে চাল নিতে এসেছিলেন। পরে কার্ডগুলো জব্দ করে প্রকৃত মালিকদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে দামুড়হুদা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও দর্শনা পৌর প্রশাসক শাহিন আলম বলেন, সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে অসহায় দুস্থদের তালিকা করা হয়েছে। পূর্বের করা তালিকা থেকেও কিছু নাম নেওয়া হয়েছে। প্রথম দিনে পৌরসভার তিনটি ওয়ার্ডে চাল বিতরণ হয়েছে। যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, একটি ওয়ার্ডে অনেক অসহায় মানুষ বসবাস করেন। সবাইকে তো কার্ড দেওয়া সম্ভব নয়। সরকার যে পরিমাণ কার্ড দিয়েছে, সেই অনুযায়ীই তালিকা করে কার্ড দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো স্বচ্ছল ব্যক্তি কার্ড পেয়ে থাকলে বা কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।








































আপনার মতামত লিখুন :