Daily Poribar
Bongosoft Ltd.
ঢাকা রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩

নকআউট পর্বে যে ৩২ দল


দৈনিক পরিবার | ক্রীড়া ডেস্ক জুন ২৮, ২০২৬, ০৯:৩৯ পিএম নকআউট পর্বে যে ৩২ দল

গ্রুপ পর্ব শেষ হতেই বিশ্বকাপের রাউন্ড অব থার্টি টুর সূচি দেখে অনেকেরই চোখ কপালে উঠেছে। ‘সি’ গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হওয়া ব্রাজিল খেলবে ‘এফ’ গ্রুপে দ্বিতীয় হওয়া জাপানের বিপক্ষে। ‘জে’ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ‘এইচ’ গ্রুপের রানার্সআপ কেপ ভার্দে। কিন্তু স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র গ্রুপসেরা হওয়ার পর শেষ বত্রিশে পেয়েছে ‘বি’ গ্রুপের তিন নম্বর দল বসনিয়াকে। একইভাবে জার্মানি পেয়েছে ‘ডি’ গ্রুপের তৃতীয় দল প্যারাগুয়েকে। প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিক, গ্রুপসেরা হওয়ার পুরস্কার কি সবার জন্য এক নয়? কেউ কেন তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ হিসেবে তৃতীয় স্থানধারী দল পাচ্ছে, আবার কেউ খেলছে রানার্সআপের বিপক্ষে? ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা কি তাহলে বঞ্চিত?
উত্তর হলো, না। এটি লটারি বা পক্ষপাতের ফল নয়। টুর্নামেন্ট শুরুর অনেক আগেই ফিফা গাণিতিক হিসাব কষে পুরো নকআউট ব্র্যাকেট নির্ধারণ করে রেখেছিল।
৩২ দলের বিশ্বকাপে নকআউটের সমীকরণ ছিল খুবই সহজ। প্রতিটি গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন খেলত অন্য একটি গ্রুপের রানার্সআপের বিপক্ষে। যেমন, ‘এ’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন খেলত ‘বি’ গ্রুপের রানার্সআপের বিপক্ষে। সব গ্রুপের জন্য একই নিয়ম ছিল। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে দল ৪৮টি, গ্রুপ ১২টি। প্রতিটি গ্রুপ থেকে প্রথম দুই দল, অর্থাৎ ২৪টি দল সরাসরি নকআউটে উঠেছে। তাদের সঙ্গে যোগ হয়েছে ১২টি গ্রুপের মধ্যে সেরা ৮টি তৃতীয় স্থানধারী দল। ফলে নকআউটে মোট দলের সংখ্যা ৩২।
ফিফা এই নতুন ফরম্যাট অনুমোদনের সময়ই প্রি-সেট নকআউট ব্র্যাকেট তৈরি করে ফেলেছিল। সেখানেই ঠিক হয়ে যায় কোন গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন শেষ বত্রিশে কোন গ্রুপের রানার্সআপকে পাবে, আর কোন গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন পাবে তৃতীয় হওয়া কোনো দলকে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত ড্রয়ে ঠিক হয়েছিল শুধু কোন দল কোন গ্রুপে খেলবে। তবে তারও আগে ফিফা নকআউটের পুরো ব্র্যাকেট নির্ধারণ করে রেখেছিল। ফলে ড্রয়ের পরই প্রতিটি দল জেনে যায় গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন বা রানার্সআপ হলে শেষ বত্রিশে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ কোন ধরনের হবে। এখন প্রশ্ন করতে পারেন, কেন এই অদ্ভুত ব্যবস্থা? কেন সব গ্রুপ চ্যাম্পিয়নকে একইরকম ‘সহজ’ বা ‘কঠিন’ প্রতিপক্ষ দেওয়া সম্ভব হলো না?
আসল কারণটা গাণিতিক
নকআউটে উঠেছে ১২ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন, ১২ রানার্সআপ ও ৮টি তৃতীয় স্থানধারী দল। তাই গাণিতিকভাবেই সব গ্রুপ চ্যাম্পিয়নকে তৃতীয় হওয়া দলের বিপক্ষে খেলানো সম্ভব নয়। সর্বোচ্চ আটটি গ্রুপ চ্যাম্পিয়নই এমন প্রতিপক্ষ পেতে পারে, বাকি চারটিকে খেলতে হয় রানার্সআপের বিপক্ষে। আর এখানেই আসে ফিফার তৈরি করা ‘প্রি-সেট নকআউট ব্র্যাকেট’।
এই সমাধানটি নকআউট সূচির ‘সি’ পরিশিষ্টে আগেই উল্লেখ করা আছে। যেমন ‘এ’ গ্রুপের তৃতীয় দল কার বিপক্ষে খেলবে, ‘সি’ গ্রুপের তৃতীয় দল কোথায় যাবে। যেহেতু সব তৃতীয় স্থানধারী নকআউটে যাবে না, সুতরাং কোন গ্রুপের তৃতীয় কোথায় যাবে, সেটা আলাদা ছক করে রাখা হয়েছিল। বলে রাখা ভালো, তৃতীয় হওয়া সেরা আটটি দলের মধ্যে কোনো র‌্যাঙ্কিং আমলে নেওয়া হয়নি (কে বেশি পয়েন্ট বা গোল ব্যবধানে এগিয়ে)।
ফিফা শুরু থেকেই নকআউট ব্র্যাকেট নির্ধারণ করেছে মূলত সূচি, স্টেডিয়াম, সম্প্রচার, নিরাপত্তা, দলগুলোর ভ্রমণ এবং খেলোয়াড়দের বিশ্রামের ভারসাম্য বজায় রাখতে। তিন দেশে ছড়িয়ে থাকা ১০৪ ম্যাচের টুর্নামেন্টে গ্রুপ পর্ব শেষে নতুন করে ড্র করা বাস্তবসম্মত হতো না।
একই গ্রুপের দুই দলকে আবার মুখোমুখি না করা
ফিফার এই ব্র্যাকেট তৈরির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো, একই গ্রুপের দুই দল যেন নকআউটের প্রথম ম্যাচেই আবার একে অপরের বিপক্ষে না পড়ে। যদি নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম না থাকত, তাহলে একই গ্রুপের শীর্ষ ও তৃতীয় দল আবার শেষ বত্রিশেই মুখোমুখি হয়ে যেতে পারত।
৪৯৫টি সম্ভাবনার জন্য আলাদা তালিকা
১২টি গ্রুপ থেকে ৮টি গ্রুপের তৃতীয় দল শেষ বত্রিশে। এর সম্ভাব্য সমন্বয়ের সংখ্যা ১২ থেকে ৮ বেছে নেওয়া, অর্থাৎ ৪৯৫। প্রতিটি সম্ভাবনার জন্য ফিফা আলাদা ম্যাপিং তৈরি করেছে। অর্থাৎ কোন ৮টি গ্রুপের তৃতীয় দল উঠেছে, তার ওপর ভিত্তি করে কোন তৃতীয় দল কোন গ্রুপ চ্যাম্পিয়নের বিপক্ষে যাবে, তা আগেই নির্ধারিত।
এই ধারণা নতুন নয়
অনেকের কাছে বিষয়টি একেবারে নতুন মনে হলেও এটি ইউরোতে আগে থেকেই চালু। উয়েফা ২০১৬ ইউরোতে ২৪ দলের ফরম্যাট চালু করার সময় একই ধরনের সমস্যার মুখে পড়েছিল। তখন ৬টি গ্রুপ থেকে ৬ দল চ্যাম্পিয়ন, ৬ দল রানার্সআপ এবং সেরা ৪টি তৃতীয় স্থানধারী দল নকআউটে ওঠে। সেখানেও সব গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন তৃতীয় স্থানধারী দল পায়নি। কোন চ্যাম্পিয়ন কোন ধরনের প্রতিপক্ষ পাবে এবং কোন তৃতীয় দল কোথায় যাবে—এসবই আগে থেকে একটি নির্দিষ্ট ম্যাট্রিক্সে সাজানো ছিল।
২০২৬ বিশ্বকাপে ফিফা মূলত সেই ধারণাকেই আরও বড় পরিসরে প্রয়োগ করেছে। তবে ৬টি গ্রুপের বদলে এখন ১২টি গ্রুপ হওয়ায় গাণিতিক হিসাব অনেক বেশি জটিল হয়ে গেছে।
ভ্রমণ, সূচি ও সম্প্রচারের ভূমিকা
ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে বলেছে, নতুন ফরম্যাট চূড়ান্ত করার সময় তারা স্পোর্টিং ইন্টেগ্রিটি, খেলোয়াড়দের কল্যাণ ও দলের ভ্রমণের বিষয় বিবেচনায় নিয়েছে। বিশ্বকাপ যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—এই তিন দেশে ছড়িয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তাই ম্যাচের ভেন্যু ও সূচি আগে থেকে নির্ধারণ করা দরকারও ছিল।
গ্রুপ ‘এ’ থেকে ‘এল’ পর্যন্ত সব গ্রুপের ম্যাচ একই দিনে শেষ হয়নি। কেউ আগে শেষ করেছে, কেউ পরে। ফলে যদি কোনো ব্র্যাকেটে এমন হয় যে একটি দল গ্রুপ পর্ব শেষ করেছে পাঁচ দিন আগে আর অন্যটি করেছে মাত্র দুই দিন আগে, তাহলে বিশ্রামের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অসমতা তৈরি হয়। প্রি-সেট ব্র্যাকেটে এই বিষয়টিও হিসাব করা হয়েছে, দুটি প্রতিপক্ষ দলের শেষ গ্রুপ ম্যাচ এবং নকআউট ম্যাচের মধ্যে বিশ্রামের দিনের ব্যবধান যেন খুব বেশি না হয়।
সহজ ভাষায় পুরো বিষয়টা
ধরুন, বাড়িতে ১২ জন অতিথি এসেছেন এবং খাবার টেবিলে–চেয়ার আছে ৮টি। সবার জন্য টেবিলে জায়গা হবে না, তাই ৪ জন দাঁড়িয়ে থাকবেন। এখন প্রশ্ন হলো, কে বসবেন, কে দাঁড়াবেন? এটা লটারি দিয়ে ঠিক না করে আগে থেকে নিয়ম করা আছে, যিনি সবচেয়ে দূর থেকে এসেছেন, তিনি বসার অগ্রাধিকার পাবেন, একই পরিবারের দুজন পাশাপাশি বসবেন না, এবং সবচেয়ে বড় অতিথিরা প্রধান টেবিলে থাকবেন। ফিফার প্রি-সেট ব্র্যাকেটও ঠিক এভাবেই কাজ করে।
আর সেই নিয়মের কারণেই ব্রাজিল পেয়েছে জাপানকে, আর্জেন্টিনা পেয়েছে কেপ ভার্দেকে।

Side banner