কর্মচারীকে মালিক সাজিয়ে নামসর্বস্ব কাগুজে প্রতিষ্ঠান ভিশন ট্রেডিংয়ের নামে ভুয়া ঋণ অনুমোদন করিয়ে ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচারের অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্ত্রী এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও এমডিসহ ৩৬ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
রবিবার (৪ জানুয়ারি) দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে ওই চার্জশিট অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে সংস্থাটির মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন জানিয়েছেন।
২০২৫ সালের ২৪ জুলাই দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে সংস্থাটির উপ-পরিচালক মো. মশিউর রহমান খান বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেছিলেন। ওই মামলায় মোট আসামি ছিল ৩১ জন, তবে চার্জশিটে আসামির সংখ্যা বেড়ে ৩৬ জন দাঁড়িয়েছে।
আসামিদের মধ্যে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের সাবেক এফএভিপি ও ক্রেডিট ইনচার্জ মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল এবং আলফা ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী কাজী মোহাম্মদ দিলদার আলম মারা যাওয়ায় তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। নতুন করে অরমিটের উৎপাল পাল, কর্মচারী প্রদীপ ও সুমন, ড্রাইভার ইলিয়াস তালুকদার, তার ভাই ওসমান তালুকদার, জাহিদ এবং হুন্ডি ব্যবসায়ী জাহিদ ও শহীদকে আসামি করা হয়েছে।
অনুমোদিত চার্জশিটে মূল আসামিরা হলেন- সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তার স্ত্রী ও ইউসিবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান রুকমীলা জামান, ইউসিবি ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি আরিফ কাদরী, ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান বজল আহমেদ বাবুল, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান এম. এ. সবুর, ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ইউনুছ আহমদ, হাজী আবু কালাম, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, আসিফুজ্জামান চৌধুরী, রোকসানা জামান চৌধুরী, বশির আহমেদ, আফরোজা জামান, সৈয়দ কামরুজ্জামান, মো. শাহ আলম, মো. জোনাইদ শফিক, অপরূপ চৌধুরী ও তৌহিদ সিপার রফিকুজ্জামান, ইউসিবি ব্যাংকের পোর্ট শাখার সাবেক সিনিয়র অফিসার মোহাম্মদ একরাম উল্লাহ, শাখার সাবেক শাখা প্রধান ও ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ চৌধুরী, সাবেক ক্রেডিট অফিসার জিয়াউল করিম খান, সাবেক এফএভিপি ও অপারেশন ম্যানেজার মীর মেসবাহ উদ্দীন হোসাইন, আরামিট পিএলসির প্রটোকল অফিসার ও ভিশন ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ফরমান উল্লাহ চৌধুরী, আরামিট পিএলসির কর্মী ও মডেল ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ মিছাবাহুল আলম, আরামিট পিএলসির এজিএম ও ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের মালিক মো. আব্দুল আজিজ, আরামিটের এজিএম ও ক্লাসিক ট্রেডিংয়ের মালিক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, আরামিটের কর্মচারী মোহাম্মদ হোসাইন চৌধুরী, মো. ইয়াছিনুর রহমান, কর্মচারী মো. ইউছুফ চৌধুরী ও মো. সাইফুল ইসলাম।
তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির (ইউসিবি) পোর্ট শাখা থেকে ভিশন ট্রেডিং নামীয় একটি নামসর্বস্ব কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই ২৫ কোটি টাকার ভুয়া ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়।
ভিশন ট্রেডিংয়ের হিসাব খোলেন ব্যাংকটির ওই শাখার সিনিয়র অফিসার মো. একরাম উল্লাহ এবং শাখা প্রধান ও ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) আবদুল হামিদ চৌধুরী, যারা কোনো প্রকার যাচাই না করেই অ্যাকাউন্ট চালু করেন। পরে প্রতিষ্ঠানটির ২৫ কোটি টাকার ঋণের আবেদনের প্রেক্ষিতে শাখার ক্রেডিট কমিটি মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে ঋণের সুপারিশ করে। এই সুপারিশ ইউসিবির করপোরেট অফিসের করপোরেট ব্যাংকিং ডিভিশনে প্রেরণ করা হয়। করপোরেট ব্যাংকিং ও ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের সমন্বয়ে গঠিত প্রধান কার্যালয়ের ক্রেডিট কমিটি প্রস্তাবটির সঙ্গে ১৭টি নেতিবাচক পর্যবেক্ষণ যুক্ত করে পরিচালনা পর্ষদের কাছে উপস্থাপন করে। এরপরও ইউসিবি পিএলসি-এর ৪৪৮তম পরিচালনা পর্ষদ সভায় ঋণ প্রস্তাবটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
আরও জানা যায়, ভিশন ট্রেডিং নামে এই প্রতিষ্ঠানটির কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই এবং এটি ছিল আরামিট গ্রুপভুক্ত সাইফুজ্জামান চৌধুরীর একজন কর্মচারীকে মালিক সাজিয়ে তৈরি করা একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান। ভুয়া কাগজপত্র দাখিল করে ঋণ অনুমোদনের পর অর্থটি স্থানান্তর করা হয় আলফা ট্রেডিং, ক্লাসিক ট্রেডিং, মডেল ট্রেডিং ও ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের মতো কয়েকটি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের হিসাবে, যেগুলো সবই সাইফুজ্জামান চৌধুরীর কর্মচারীদের নামে খোলা। এভাবে পরস্পর যোগসাজশে প্রতারণা, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এই ঘটনায় দণ্ডবিধি, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের একাধিক ধারায় অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে।








































আপনার মতামত লিখুন :