১৯৯৬ সালের ১০শে জুলাই। এসএসসির ফলাফল প্রকাশ হলো স্টার মার্কস পেয়ে পাশ করেছি। গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজিতে লেটার মার্কস পেয়েছি, দুই নম্বরের জন্য ভূগোল ও চার নম্বরের জন্য কৃষি শিক্ষায় লেটার মার্কস পাইনি। মার্কসিট পেয়ে মন খারাপ, প্রত্যাশিত নম্বরও পাইনি আর বিশেষ করে কৃষি শিক্ষায় ব্যবহারিক পরিক্ষায় চল্লিশ নম্বরের মধ্যে পেয়েছি ত্রিশ! পুরো কেন্দ্রে সবচেয়ে ভাল পরিক্ষা দিয়েছি। আমার স্কুলের শিক্ষকরা কৃষি শিক্ষা ব্যবহার পরিক্ষার দিন দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষকগণকে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে যে আমাদের স্কুলের ফাস্ট বয়। তাছাড়া বাগানবাড়ি আইডিয়েল একাডেমী সেসময় মতলব উত্তরের উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। হয়তো শিক্ষকদের স্বার্থকতা নিজ শিক্ষার্থীকে আস্থার সাথে প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেয়া আর সেটা প্রমাণও করলাম। কেন্দ্রের প্রায় সকল পরিক্ষক আমার প্রশংসাও করলেন কিন্তু ফলাফল দশ নম্বর কম পেলাম যেখানে চার নম্বরের জন্য লেটার বঞ্চিত! যাই হোক সেটার কারণ উদঘাটন হলো। স্কুলে কৃষি শিক্ষা ব্যবহারিক ক্লাস চলাকালীন আমি মাঠে ক্রিকেট খেলছিলাম যদিও আমার সাথে মাঠে খেলছিলো তখনকার সময়ে জ্ঞান, বিদ্যা ও প্রতিভার এক অনন্য সংযোগ আমাদের প্রিয় শিক্ষক আব্বাস উদ্দিন স্যার। স্যার পরবর্তীতে স্যার চাঁদপুর গনি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন কৃতিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। আব্বাস উদ্দিন স্যারকে আমরা ক্রিকেটার বানিয়ে ফেলেছিলাম এবং বিভিন্ন টুর্নামেন্টেও স্যার আমাদের দলে খেলতেন। জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষকতা পেশায় স্যারের অনেক স্বীকৃতি ও অর্জন আছে। ক্রীড়া শিক্ষক নুরুল হুদা স্যার, গণিতের শিক্ষক শাহ আলম স্যার, একাউন্টিং শিক্ষক আজিজ স্যারও স্কুল মাঠে আমাদের সাথে খেলতেন। আমার ছেলেবেলা প্রায় সবটাই শিক্ষকদের সান্নিধ্যে কেটেছে। বাড়ীতে দুইজন গৃহশিক্ষক একজন হাইস্কুলের যেমন: শাহ আলম স্যার, বোরহান স্যার (আমার স্কুল জীবনে) পর্যায়ক্রমে। আর একজন মোশারফ (খোকন) স্যার যিনি মতলবে কৃষি অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করতেন। আমাদের বাড়ি থাকতেন ও আমাদের পড়াতেন। আমি ক্লাস ওয়ান থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত তাকে পেয়েছি। চাকুরির বদলী জনিত কারণে পরবর্তীতে তিনি অন্যত্র চলে যান। তার বাড়ি কুমিল্লার রেইসকোর্সে। তাই ছোট বেলা থেকেই ছাত্র-শিক্ষকের মাঝে সবকিছু ছাপিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল যেখানে সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধও ছিল অটুট। যাই হোক পরবর্তীতে জেনেছি ব্যবহারিক ক্লাসে একদিন উপস্থিত না থেকে অপেক্ষাকৃত বড় স্যারকে নিয়ে মাঠে ক্রিকেট খেলার অপরাধের ফলাফল স্বরূপ ফাইনাল পরিক্ষায় আমাকে ১০ নম্বর কম দেয়ার সুপারিশ হয়েছে। যদিও আমাকে বলা হয়েছে কেন্দ্রের স্যাররা এটা করেছে।
এবার ইন্টারমিডিয়েট ভর্তির পালা। বন্ধুরা একযোগে পরামর্শ করছি কে কোথায় ভর্তি হবো! বাবা জেঠাতো ভাই আলমীর হোসেন (বর্তমানে পল্লবী মহিলা ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ) ভাইকে ডাকলেন এবং আমাকে তার সাথে ঢাকা পাঠালেন আর বলে দিলেন ঢাকা কলেজ, নটরডেম কলেজের ফর্ম নিয়ে যেন আমাকে কুমিল্লার কে আলী বাসে উঠিয়ে দেয়, তখন কে আলী বাস ছিল ঢাকা কুমিল্লার পরিবহন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ফর্ম নিয়ে তারপর বাড়ি ফিরি। আমার আপন বড় ভাই রফিকুল ইসলাম তখন সিংগাপুরে। ১৯৯২ সালের দিকে দাউদকান্দি হাসানপুর শহীদ নজরুল সরকারি ডিগ্রী কলেজে ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে, কলেজ সংসদ থেকে নির্বাচন, ছাত্রত্ব বিসর্জন ও পরবর্তীতে বাবা বিদেশ পাঠিয়ে দেন।
আমি ফর্ম নিয়ে বাড়ি ফিরি এবং বাবা দুটি ফর্ম রেখে ভিক্টোরিয়া কলেজের ফর্ম দিয়ে বলে ফিলাপ করে জমা দিয়ে আসো। তার মানে বুঝলাম বাবা চাইছেন আমি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়াশুনা করি যেখানে ঢাকা আমাদের প্রথম শহর ও যেখানেই প্রায় আমাদের সব আত্মীয় স্বজন। বাবা আমাকে ক্লাস সিক্সেই কুমিল্লা জিলা স্কুলে ভর্তি করাতে চেয়েছিলেন, ভর্তি পরিক্ষাও দিয়েছিলাম কিন্তু আমি যেতে চাইনি। এ নিয়ে আমাদের গ্রামের স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মানিকলাল বাবু, স্কুলের অন্যান্য শিক্ষক ও সেই সময়ের আমাদের এলাকার বিশিষ্টজনদের সামনে একদিন স্কুলে বসলেন তখনো সিক্সে ভর্তি হইনি। আমার সম্মতি চাইলেন আমি কোনভাবেই গ্রাম ছাড়তে রাজি নই। অবশেষে বাধ্য হয়েই গ্রামে ভর্তি করালেন।
উল্লেখ্য যে বাগানবাড়ি আইডিয়েল একাডেমীর অন্যতম প্রতিষ্ঠা সদস্য ছিলেন এবং দীর্ঘসময় ম্যানেজিং বোর্ডে থেকে স্কুলকে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে দাঁড় করাতে নিরলস চেষ্টা করে গেছেন আমার বাবা নুরুল ইসলাম প্রধান (ধনু মেম্বার)। ধনু মেম্বার নামেই পরিচিতি। তিনি এমনিতেই যেদিন স্কুলে যেতেন কেমন যেন একটা পরিবেশ হয়ে যেত। শিক্ষক স্টাফ সহ সবার মাঝে যেন আদর-যত্ন, খাতির ও অনেকটা সুনসান নীরবতাও! কম কথা বলতেন কিন্তু প্রচন্ড রাগী মানুষ ছিলেন। যদিও তার মেম্বারি জীবনের কোন স্মৃতি আমার মনে নেই। জনপ্রতিনিধিত্বের বাইরে তিনি ছিলেন ব্যবসায়ী, সমাজসেবক ও ন্যায়পরায়ণ লোক। বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এর সাথে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত ছিলেন। সার, কিটনাশকের ডিলার, এম আর ডিলার, কৃষিপণ্য ও কৃষি উপকরণ ছিল তার মুল ব্যবসা। এছাড়া কৃষিকাজেও জড়িত ছিলেন। মতলবের অন্যতম প্রাচীন বাজার কালির বাজার ছিলো তার ব্যবসাস্থল। কালির বাজারের অবস্থান উল্লেখ করলে পূর্বপার্শ্বে দাউদকান্দি-কুমিল্লা, উত্তর পার্শ্বে গজারিয়া-মুন্সিগঞ্জ শুধুমাত্র নদী দ্বারা পৃথক। তিন থানার লোকজনই ছিল বাজারের প্রাণ। তিনি বাজারের উপদেষ্টা কমিটির নির্বাচিত সভাপতিও ছিলেন। বাবার আমলে আমরা ছিলাম বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার লোক। ওই আমলে কুমিল্লা আসা যাওয়া ও কাজকর্মের খাতিরেই হয়তো কুমিল্লাকে তিনি ভালোবেসে ফেলেছিলেন তাই ভিক্টোরিয়া কলেজ নামকরা কলেজ, কুমিল্লা শান্ত শহর, রাজনৈতিক ঝামেলা কম, টাটকা শাক-সবজি নানাবিধ বিষয় ব্যাখ্যা করে কুমিল্লার পক্ষ নিতেন। তাই ভিক্টোরিয়া কলেজই সাব্যস্ত হলো।
যথারীতি ভর্তি পরিক্ষার ফল প্রকাশ হলো ৭৬৮ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির সর্বনিম্ন নম্বর, আমার নম্বর হলো ৭৯০।
উল্লেখ্য যে, আমাদের সময়ে নম্বরের ভিত্তিতে ভর্তি ছিল। বাবা ও জাহিদ ডাক্তার (আমাদের এলাকার ফ্যামিলি প্লানিং হসপিটালের ডাক্তার- অনেকটা আমাদের পারিবারিক ডাক্তার ছিলেন) আমাকে সাথে নিয়ে এসে ভর্তি করালেন এবং আমাদের সম্পর্কীয় আত্মীয় তখককার সময়ের রামঘাটলায় অবস্থিত শেফা আলট্রাসনোগ্রাফির ডা. নুরুশ শাফির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে যান লোকাল গার্ডিয়ান হিসেবে (যদিও খুব কদাচিৎ যাওয়া হতো তার কাছে)। লাঞ্চ করালেন শাসনগাছার ভাই ভাই রেস্টুরেন্টে এবং বলে দিয়ে গেলেন হোটেলে খেলে যেন এখানে এসে খাই।
ভর্তি পর্ব শেষ। একদিকে স্কুল বন্ধুদের ছড়িয়ে যাওয়ার বিরহ অন্যদিকে নতুন চ্যালেঞ্জ। এবার থাকার বন্দোবস্তের জন্য আলমগীর ভাই ও ভিক্টোরিয়া কলেজের সাবেক আরেক বড় ভাই আরিফ ভাইকে (আমার এলাকার) সাথে দিয়ে আব্বা (আমরা আব্বা বলে ডাকতাম) আমাকে ভর্তি হতে পাঠালেন এবং থাকার বন্দোবস্ত করে যেতে বললেন।
আরিফ ভাই কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ও তার কুমিল্লা ভালো জানাশুনা আছে সেজন্যই আরিফ ভাইকে সাথে পাঠানো। তিনি কলেজে এসে তখনকার সময়ের জনপ্রিয় ছাত্রনেতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এবং আমার জন্য উপযোগী একটা মেস ঠিক করে দেয়ার দায়িত্ব দেন, যার কথা বলছি তিনি পরবর্তী সময়ে কলেজ সংসদের ভিপি হয়েছিলেন। আর আমাকে যে ভাই বাইকে করে রেইসকোর্স একটি মেসে আমাকে উঠিয়ে দিয়ে আসেন তিনি পরবর্তীতে কলেজ সংসদের জিএস নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এবার মুল জায়গায় আসি। নিউহোস্টেল! আসলে আমাকে হোস্টেলে উঠার ব্যাপারে অনাগ্রহ করা হয়েছিল কারণ হোস্টেলে অনেক ছাত্ররা একসাথে থাকে, ঝামেলা বাধার সম্ভবনা বেশি, হোস্টেলের খাবারের মান ভাল না, সেখানে রাজনৈতিক প্রভাব বেশী ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে বড় ভাই রাজনীতিতে জড়িয়ে শিক্ষা জীবন থেকে ছিটকে পড়ার কারণে আবার বাবা অনেকটা হতাশ ছিলেন তাই আমার ক্ষেত্রে যেন তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। এছাড়া আমার বাবা স্কুলজীবনে আমার দাদাকে হারানোর পর তিনি পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে নিজের শিক্ষাজীবন বিসর্জন দিয়ে আমার দুই চাচাকে উচ্চ শিক্ষিত করেছে (আজ দুই চাচার পরিবারই আমেরিকায়) কিন্তু নিজের সন্তানকে উচ্চ শিক্ষা দিতে না পারাটা হবে তার জন্য কষ্টের!
তাই হোস্টেলের সার্কুলারও খুজিনি আর হোস্টেলেও উঠিনি। রেইসকোর্স এসপি মতিন সাহেবের বাসা হলো আমার কলেজ জীবনের প্রথম মেস। কিন্তু মেস জীবনে দেখলাম সমস্যা আরো বেশী! বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের একসাথে অবস্থান, মিলের হিসাব রাখা, বাজার করা, রান্নার জন্য বুয়া খোঁজা ইত্যাদি ইত্যাদি। রেইসকোর্স ও মেসের সুবাদে ভিক্টোরিয়া কলেজের পাশাপাশি কুমিল্লা কলেজের অনেককেও বন্ধু হিসাবে পেয়ে গেলাম। বোরহান (মেরিন ইঞ্জিনিয়ার) উল্লেখযোগ্য। একবার ইলেকট্রিক শক থেকে আমাকে বাঁচিয়েছে, আমি তার কাছে ঋণি। সে পুরো মেস জীবনে আমার সহযাত্রী ছিল। মাঝে মধ্যে বিভিন্ন প্রোগ্রামে বন্ধুদের সাথে কুমিল্লা কলেজেও যেতাম। আর কুমিল্লা কলেজের ইংরেজির প্রফেসর আবু বকর সিদ্দীক স্যারও আমাদের পাশের গ্রামের মানুষ, বাবা তার সাথেও পরিচয় করিয়ে দিয়ে এসেছিলেন এবং আমাকে ইংরেজি পড়ানোর জন্য বলে দিয়ে এসেছিলেন। তিন চার মাস পড়ানোর পর বললো তোমার ইংরেজি পড়া শেষ! অবশ্য আমরা বিজ্ঞানের ছাত্ররা ফিজিক্স, ক্যামেস্ট্রি, বায়োলজি আর ম্যাথ নিয়েই বেশী সময় দিতাম। বাংলা ও ইংরেজি শুধু পরিক্ষার আগে পড়তাম যেন এগুলো ঐচ্ছিক সাবজেক্ট। কেমিস্ট্রির রেজাউল করিম স্যার, হাসেম স্যার, হারান স্যার, ফিজিক্সের হারুন স্যার, কুন্ড গোপী স্যারকে বিশেষভাবে স্মরণ করছি। বায়োলজির জসিম স্যারকে আশা করি বিজ্ঞানের কোন শিক্ষার্থী ভুলবেনা! কমন রুমে মেজর হাফিজ স্যারের দৌঁড়ানি এখনও চোখে ভাসে। আমরা কিছু দুষ্ট ছাত্ররা অপেক্ষা করতাম সুনীল দা কখন আসবে? ক্লাসে না থাকলেও পড়াশুনার উদ্দেশ্যে স্যারদের বাসায় যাওয়া ছিলো রুটিন কাজ।
রেইসকোর্সের মেসের পর শেষ মেস ছিল টমছমব্রীজ ঈদ গাহের পাশে। প্রথম বর্ষ প্রায় মেসেই কাটিয়ে দিলাম। টমছমব্রীজে মেসে থাকাকালীন আমাদের এক কলেজ বন্ধু নিউহোস্টেলের সুমন আসতো তার বড় ভাইয়ের (বড় ভাই এখন সদর থানার এক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান) কাছে যেখানে আমি থাকতাম। সেই সুবাদে ওর সাথে পরিচয় ও বন্ধুত্ব। এক প্রকার ওর জোড়াজুড়িতেই আমার হোস্টেলে উঠা। আমাদের সময় মোমেন স্যার ছিলেন হোস্টেল সুপার কিন্তু তিনি থাকতেন ঠাকুরপাড়ার বাসায়।
হোস্টেলে এসে উত্তর ব্লকের (রবীন্দ্রনাথ ছাত্রাবাস) ১০ নাম্বার রুমে প্রথম উঠি। যতটুকু মনে পড়ে আশিক, মুকিত, আনিস ছিলো আমার প্রথম রুমমেট। তারপর এই রুম ওই রুম করে থিতু হই ৮ নম্বর রুমে। আমার রুমমেটদের মধ্যে ডা. সুজন (ঢামেকে কর্মরত), আবুল বাশার (পুলিশ কর্মকর্তা) ও পারভেজ (মৎস্য অধিদপ্তরে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা)। দ্বিতীয় বর্ষে হোস্টেলে উঠায় নতুন বিল্ডিংয়ে উঠার সুযোগ হয়নি। অবশ্য বন্ধুদের নম্বরের যে প্রতিযোগিতা ছিল হয়তো নতুন বিল্ডিংয়ে সিট নাও পেতে পারতাম। হোস্টেলে এসে অনেক অঞ্চলের অনেক বন্ধুকে পেয়ে যেন পেয়ে গেলাম বন্ধুদের বিশাল এক রাজ্য! আড্ডাবাজি, ক্রিকেট-ফুটবলে মেতে উঠা, বন্ধু আবুল বাসার ডাব পাড়তো আর সুজন আমি নিচে ডাব খেতাম। পরে গজাল নিয়ে বাশার গাছে উঠত আর উপরেই ছিদ্র করে ডাবের পানি খেত, ঘুরে বেড়ানো কখনো বার্ডে, কখনো ধর্ম সাগর পাড়, নিউহোস্টেলের পুকুর ঘাট অথবা তিন তলার ছাদে মান্না, হেমন্ত, ভূপেন হাজারিকার গান, রাত দেড়টা-দুইটা অব্ধি টেবিল টেনিস খেলা, রাতে দল বেধে টমছমব্রীজ বা রেল স্টেশন খেতে যাওয়া, তারপর যার যার রুমে গিয়ে পড়তে বসা। প্রায়ই ফজর পড়ে ঘুমোতে যাওয়া। সকালের নাস্তার ক্ষেত্রে ডাইনিং বয় ইব্রাহিমকে বলে রাখা ছিল যেদিন আলুভর্তা হবে সেদিন আমার জন্য যেন খাবার রেখে দেয়। সত্যি বলতে আলু ভর্তা, ডিম ভাজা ও ডাল এখনো পছন্দের খাবার রয়ে গেছে। আর আমাদের একা খাওয়া খুব কমই হতো। কয়েকজন মিলে বড় বোলে ভাত নিতাম, তরকারি যাই থাকুক ডিম ভাজা আবশ্যিক, দলবেঁধে একসাথে খাওয়া। সত্যিই দিনগুলো ভুলার নয়।
উল্লেখযোগ্য একটি স্মৃতিচারণ হলো পুরো নিউহোস্টেলের প্রায় সবার ন্যাড়া হওয়া! বন্ধুদের নিয়ে আড্ডাবাজি যতই হোক মুল লক্ষ্য পড়াশোনা ও ভালো ফলাফল। সামনে টেস্ট পরিক্ষা, চুল কাটতে টমছমব্রীজ গেলাম। পুরো মাথা ন্যাড়া হয়ে চলে এলাম হোস্টেলে। উদ্দেশ্য ছিল টাক মাথা হয়ে গেলে বাইরে বেড়োনো কমবে, আড্ডাবাজি কমবে, রুমে বন্ধি থাকা মানে পড়াশুনা। কোন রকমে সবার অগোচরে রুমে ঢুকতেই আমার রুমমেট বন্ধুরা আমাকে নিয়ে একচোট মস্কারা! ডাইনিংয়ে রাতের খাবার খেতে গিয়ে পড়লাম মহা বিপদে! কেউ বেলমাথা বলে মজা করছে, কেউ খাবার প্লেট দিয়ে ঠাস, কেউ এসে ঠোন্ডা (আঞ্চলিক ভাষা) দিয়ে বলে দেখলাম বেল পাকছে কিনা! ইত্যাদি ইত্যাদি!!
পড়ে গেলাম মহাবিপদে! কি করি? কোনক্রমে খাওয়া দাওয়া শেষ করে রুমে ফিরলাম আর ভাবতে থাকলাম কি করা যায়! বুদ্ধি করলাম দল ভারি করতে হবে। প্রথম রায়েই ঘুমের মধ্যে আমাদের রুমের বাকি তিন বন্ধুর চুল কেটে দিলাম কাঁচি (বায়োলজি সিজার) দিয়ে। এমনভাবে কাটলাম যেন ন্যাড়া হওয়া ছাড়া উপায় নেই। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে সবাই একসাথে সেলুনে এবং সবাই ন্যাড়া! এরপর অভিযান পাশের রুমে। এভাবে কয়েকদিনের মধ্যে পুরো নিউহোস্টেল ন্যাড়া! আমাদের এই ভাইরাস তখন ১ম বর্ষের ছোট ভাইদের মধ্যেও ছড়িয়ে গিয়েছে। ফলাফল যেই সেই। সবাই টাক এবং একযোগে আবার ন্যাড়া মাথায় শহর ঘোরা! এ যেন ট্রেন্ড।
আজ উপলব্ধি করছি নিউহোষ্টেল জীবন ছিল আমাদের মনোবিকাশ ও বন্ধুত্বের এক অপরিসীম উপাদান। সময়ের ব্যবধানে আমরা আজ যে যেখানেই থাকিনা কেন আমাদের অকৃত্রিম ও নিঃস্বার্থ বন্ধু এবং ভাইগুলো ভালো থাকুক। মাথা উঁচু করে দাঁড়াক স্বমহিমায়। সকল সমস্যা পাশ কাটিয়ে নিউহোস্টেল দাঁড়িয়ে থাকুক আপন গৌরবে ইতিহাসের অংশ হয়ে। নিউহোস্টেল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন এই স্মৃতিচারণ করার সুযোগ দেওয়ায় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের আহবায়ক, সদস্য সচিব সহ সকল নেতৃবৃন্দকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। এছাড়াও নিউহোস্টেলের সকল বন্ধু, অগ্রজ ও অনুজদের বন্ধন হোক নিঃস্বার্থ ও চিরস্থায়ী।
জয় হোক নিউহোস্টেলিয়ানদের।
নাজমুল হক
১৯৯৮ এইচএসসি ব্যাচ।
B.Sc Hon (Chemistry) M. Sc, Textile Technology (PGD)
EX Head of Department
Research & Development (R&D - Fabrics)
Sinha Knitting Ltd.(STG), Apex Holdings Ltd., Fakir Knitwears Ltd.,
Ex Technical Manager: Creora Spandex, Hyosung Corporation (Attachment VN Plant)
Owner & CEO
Naheel Textile Solutions
Newstar Spandex, Saheel Handwash, Saheel Liquid Detergent, Saheel Car Shampoo








































আপনার মতামত লিখুন :