Daily Poribar
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩

রেমিট্যান্সযোদ্ধারা দেশ উন্নয়নের অগ্রদূত 


দৈনিক পরিবার | শাহজাহান আবদালী এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ০৮:৫৯ পিএম রেমিট্যান্সযোদ্ধারা দেশ উন্নয়নের অগ্রদূত 

এদেশ থেকে যারা বিদেশে গিয়ে আয়-রোজগার করে যে অর্থ স্বদেশে পাঠান, সেই অর্থকে রেমিট্যান্স বলে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় এক কোটি বিশ লক্ষ বাংলাদেশি রেমিট্যান্সযোদ্ধা কর্মরত রয়েছেন। ১৯৭৭ সাল থেকে কাজের উদ্দেশে এদেশীয়রা বিদেশে যাওয়া শুরু করেন এবং বর্তমানে তাদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। আমাদের এই রেমিট্যান্সযোদ্ধারা জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের মধ্যে অধিকাংশই স্বশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত,তবে কায়িকশ্রমে তারা বিশ্বের অন্যান্য পরিশ্রমী জনশক্তি অপেক্ষা অগ্রগামী। ফলে,বিদেশে কর্মক্ষমতার জন্য আমাদের শ্রমজীবী জনশক্তির যেমন চাহিদা রয়েছে, তেমনই তারা প্রশংসিত। 
অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানীগুলোর সঙ্গে এদেশের জনশক্তি রপ্তানি এজেন্টগুলোর মধ্যে লেবার পেশায় নিয়োগ সংক্রান্ত চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী লেবার ভিসায় জীবীকার উদ্দেশে শিক্ষানবিশদের সঙ্গে  অনেক উচ্চশিক্ষিতরাও বিদেশে যান। সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে কায়িক পরিশ্রমী এবং কর্মদক্ষতার উপযোগিতা বেশি বলে শিক্ষিতদেরও লেবারের কাজই করতে হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিদেশিরা সার্টিফিকেট দেখতে চায় না,কাজের দক্ষতাই তাদের কাছে বেশি মূল্যায়িত হয়। ফলে,উচ্চশিক্ষিত হয়েও পরিশ্রমে অনীহ এবং অদক্ষতার কারণে অনেক রেমিট্যান্সযোদ্ধা দেশে ফেরত আসতে আসতে বাধ্য হন।
উচ্চশিক্ষিত রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের অনেকেরই ধারণায়  প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অনুযায়ী বিদেশে কাজের মানদণ্ড নির্ধারিত হয়। কিন্তু ভাবনা যখন বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না তখন তারা আশাহত হন। এছাড়া উচ্চতর ডিগ্রি থাকায় তাদের মধ্যে এক ধরনের অহংবোধ কাজ করে। তারা অর্ধশিক্ষিত বা স্বশিক্ষিতদের সঙ্গে একই ধরনের কাজ করতে দ্বিধা ও সংকোচবোধ করেন। অপরদিকে যারা স্বশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত তারাই মনের মধ্যে অসীম সাহস ও ঝুঁকি নিয়ে যে-কোনো কর্মে মনোযোগী হন। কঠোর কায়িক পরিশ্রমকে তারা পরিবার-পরিজনের সচ্ছলতা ও সুখের জন্য উৎসর্গ করেন। কষ্টের কণ্টকমালা গলায় ঝুলিয়ে তারা মাসের পর মাস,বছরের পর বছর বিদেশ-বিভুঁইয়ে পার করে দেন। 
তাদের অনেকে খোলা আকাশের নিচে প্রচণ্ড রোদ্র উপেক্ষা করে ফোরম্যানের নির্দেশে বহুতল ইমারতের নির্মাণসামগ্রী কাঁধে করে উঁচুতে বহন করতে হয়। এত পরিশ্রমের পরেও দিনশেষে বাসায় এসে রান্না করে খেতে হয়। 
তাদের বিশ্রামের এবং ঘুমানোর জন্যো উপযুক্ত আশ্রয় থাকে না। ফলে রাতে এক রুমে গাদাগাদি করে ১৫/২০ জনকে থাকতে হয়। বুকসেলফে যেমন বই থাকে,তেমনি রুমের ভেতরে তিনপাশে থাকে মানুষসেলফ। রুমের উপর এবং নিচের মাঝামাঝিতে তৈরি সেলফে রেমিট্যান্সযোদ্ধারা রাত্রিযাপন করেন। এমন নির্মম ও করুন বাস্তবতা আমাদের কল্পনা করাও কষ্টসাধ্য। 
গভীর নিশিতে হয়তো তাদের স্বপ্নে আত্মীয়-স্বজনের মুখ, জন্মভূমির গাছ-পালা, নদী-নালা,পশু-পাখির দৃশ্য ছবির মতো ভেসে ওঠে। এসব স্মৃতি তাদের মনে কষ্ট দেয়। কারো কারো দু’চোখে অশ্রু জমে ওঠে। কিন্তু, উপায় কী! পেটের দায়ে এখানে আসতে হয়েছে। ফেরত চলে গেলে সংসারে শুরু হবে অশান্তি। অনেকে মা-বাবার ভিটে-মাটি বিক্রি করে এসেছেন। কেউ কেউ এসেছেন ঋণ করে। সেই ঋণের টাকা পরিশোধ না করলে নিজের ও পরিবারের সীমাহীন ক্ষতি হয়ে যাবে। এমন দুর্দশায় তারা পড়তে চান না।
অনেকে অনুশোচনা করেন,দেশে থাকতে কেন পড়াশোনা করিনি। উচ্চশিক্ষিত হতে পারলে দেশে হয়তো কোনো একটা চাকরি জুটে যেত। এদেশে এসে গোলামি করতে হতো না। সেই কারণেই তারা ছোট ভাইবোন কিংবা কেউ কেউ নিজের সন্তানকে চিঠিতে অথবা ফোনে বারবার তাগিদ দেন,তোমরা ঠিকমতো পড়াশোনা করবে। বিদেশে এসে বুঝতে পেরেছি লেখাপড়া কী জিনিস। বিদেশি ফোরম্যানের অধীনে কাজ করতে হয়। কখনো কখনো ফোরম্যানের ধমক খেতে হয়। কিছুই করার নেই। তাদের মতো পড়ালেখা জানলে নিজেও ফোরম্যান হতে পারতাম। 
কেউ কেউ বিদেশে থাকাবস্থায় জানতে পারেন,সন্তানের পিতা হয়েছেন। কিন্তু সন্তানের মুখ সরাসরি দেখার সুযোগ নেই। বর্তমানে অনেকেই মোবাইলে ছবি তুলে ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে নবাগত সন্তানের ছবি পাঠাচ্ছেন। ১০/১২ বছর আগে তাও সম্ভব ছিল না। তখন যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল চিঠিপত্র। কোনো কিছু চাওয়া-পাওয়া থাকলে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নিয়ে আদান-প্রদান করতে হলে এক মাস লেগে যেত। এখন অনেক সুবিধা হয়েছে। মোবাইলে কিংবা ইমোতে সরাসরি কথা বলা সম্ভব হচ্ছে। 
সত্যিকার অর্থে রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের পরিশ্রমেই দেশটি টিকে আছে। অথচ,স্বদেশে তাদের সঠিক মূল্যায়ন হয় না। অনেক কষ্ট ও পরিশ্রমে উপার্জিত টাকা দেশে পাঠাচ্ছেন। সেই সঙ্গে দেশটিরও উন্নয়ন হচ্ছে অর্থনৈতিকভাবে। এত কিছুর পরও তারা দেশের এয়ারপোর্টে এসে হতবাক হয়ে যান। এয়ারপোর্টের কোনো কোনো কর্মকর্তা ও কর্মচারি তাদের সাথে অনৈতিক আচরণ করে থাকেন। মালামাল চেক করার নামে অনেকে তাদের জিনিসপত্র হাতিয়ে নেন। অনেকে তাদের মালামাল টেনে-হিঁচড়ে ছিনিয়ে নেন। তারা শুধু অসহায় দৃষ্টিতে হা করে তাকিয়ে থাকেন। মুখের ভাষা তারা হারিয়ে ফেলেন। মনে মনে বলেন,এ-কোন দেশে এলাম?
এদেশের রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের রয়েছে সীমাহীন ক্ষোভ ও অভিযোগ। কোনো কারণে সেদেশে কারো মৃত্যু হলে সেই লাশটি এদেশের সরকার সরকারিভাবে দেশে আনার ব্যবস্থা করে না। অপরদিকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের কোনো নাগরিকের মৃত্যু হলে সেই দেশের সরকার সরকারি খরচে লাশটি তাদের দেশে নিয়ে যায়। গণমাধ্যমে প্রায়ই প্রকাশিত হয়,এদেশের নাগরিকরা বাংলাদেশের দূতাবাস বা হাইকমিশন অফিসে গিয়ে শতবার যোগাযোগ করেও কোনো ফল পান না। 
বিষয়টি আমাদের পীড়া দেয়। আমরা আশা করব, ব্যাপারটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে অতি শিগগির সরকারএটি সমাধানে এগিয়ে আসবে।
এদেশের নারী শ্রমিক পাঠানো নিয়েও রয়েছে যথেষ্ট অনিয়ম, অভিযোগ ও দুর্নীতি। দেশের এক শ্রেণির দালাল অধিক মুনাফা লাভের জন্য নারী শ্রমিকদের বিদেশে পাঠাচ্ছেন গৃহকর্মী পেশার প্রলোভন দেখিয়ে। কিন্তু বিদেশে গিয়ে তারা জানতে পারেন,তাদেরকে আনা হয়েছে যৌনকর্মী হিসেবে। সুতরাং তাদের একদিকে যেমন বিশ্বাস ভঙ্গ হচ্ছে,অন্যদিকে তারা বাধ্য হয়ে পাপ কাজে লিপ্ত হতে হচ্ছে। এই পাপ কাজে অনিচ্ছা পোষণ করলে তাদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। 
এমনকি বিদেশি কফিল দ্বারা তারা ঘরবন্দি হয়ে পড়েন। শাষাণো হয়,তাদের কথামতো কুকর্মে রাজি না হলে পুলিশে ধরিয়ে দেবে। 
এই অপকর্ম থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য কেউ কেউ অশ্রুসজল কণ্ঠে আত্মীয়স্বজনের কাছে গোপনে ভিডিও করে পাঠান। কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এমন পরিস্থিতিতে এদেশের সরকার দালাল ও প্রতারকদের ধরে এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে এ ধরনের অপকর্ম দিনে দিনে বাড়তেই থাকবে এবং পাপের বোঝাও ভারি হবে। 
রেমিট্যান্সযোদ্ধারা গ্রামে এসেও অবমূল্যায়নের শিকার হন। তারা যেন অবহেলার পাত্র। বিদেশে থাকাকালে এ সংগঠন, সে সংগঠন কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কতনা টাকা পাঠিয়েছে। কিন্তু সেসব প্রতিষ্ঠানে নানা বিষয়ে অনুষ্ঠান হলে তাদেরকে সামান্য সম্মানটুকুও দেওয়া হয় না। কারণ একটাই,তাদের মধ্যে অনেকেরই নেই সার্টিফিকেট। এদেশের শিক্ষিত ও সমাজপতিদের আচরণে তারা ভীষণ কষ্ট পান। এ কারণেই অনেকে স্বদেশে এসে ঘর থেকে বের হতে চান না। বিদেশে পরিশ্রম করলেও মন্দের ভালো হিসেবে তারা মানসিকভাবে শান্তিতে থাকেন। সেখানে নেই কোনো ভণ্ডামী। অনেকে ছয় মাসের ছুটি নিয়ে এলেও তিন মাসের মাথায় চলে যান। এমনকি তারা কর্মজীবনের হিসাব মিলাতে পারেন না। বাড়িতে তাদের পাঠানো টাকা অনেক সময় স্বার্থপর নিকটজনেরা আত্মসাৎ করে ফেলে। ফলে তাদের জীবনে  নেমে আসে কষ্ট আর হতাশায়। এমন নানা অযাচিত ঘটনায় তারা যেন দুঃখ-শোকের ঠিকানাবিহীন পথযাত্রী হয়ে পড়েন।
শাহজাহান আবদালী 
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রশিক্ষক, বক্তৃতা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ঢাকা।

Side banner