Daily Poribar
Bongosoft Ltd.
ঢাকা রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২
স্মরণ নয়, বিচার চাই

নুসরাতের মৃত্যুবার্ষিকীতে পরিবারের আর্তনাদ!


দৈনিক পরিবার | আবদুর রহিম এপ্রিল ১১, ২০২৬, ১২:৪৩ পিএম নুসরাতের মৃত্যুবার্ষিকীতে পরিবারের আর্তনাদ!

তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন নুসরাত জাহান রাফি। একটি পরিবারের স্বপ্ন, ভালোবাসা আর আশার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু ২০১৯ সালের সেই নৃশংস ঘটনায় আগুনে পুড়ে নিভে যায় তাঁর জীবনপ্রদীপ। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সাত বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার এখনো সম্পূর্ণ হয়নি, যা নিয়ে হতাশা, ক্ষোভ আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাঁর পরিবারের।
ঘটনার পটভূমি ও নির্মমতা
২০১৯ সালের ২৭ মার্চ, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা-এর অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ দৌলা নুসরাতকে তাঁর কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন। নুসরাত সাহস করে মামলা দায়ের করেন, যা পরবর্তীতে তাঁর জীবনের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।
৬ এপ্রিল, পরিকল্পিতভাবে তাঁকে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ভয়াবহভাবে দগ্ধ অবস্থায় পাঁচ দিন লড়াই করে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
রায় ও দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির তালিকা
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর, ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য এস এম সিরাজ-উদ দৌলা (অধ্যক্ষ), রুহুল আমিন (সাবেক উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি), মাকসুদ আলম (সাবেক পৌর কাউন্সিলর ও রাজনৈতিক নেতা), কামরুন নাহার মণি, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন, জাবেদ হোসেন, মো. ইকবাল হোসেন, ফয়সাল হোসেন, মাহমুদুল হাসান, মো. রিয়াজ উদ্দিন, আবদুল কাদের এবং আরও কয়েকজন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও সহযোগী।
(উল্লেখ্য: আসামিদের মধ্যে কয়েকজন সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় এবং বাকিরা পরিকল্পনা ও সহযোগিতায় জড়িত ছিল।)
বর্তমানে মামলাটি উচ্চ আদালতে ‘ডেথ রেফারেন্স’ হিসেবে বিচারাধীন। কিছু আসামির শুনানি শেষ হলেও বাকিদের শুনানি এখনো চলমান।
পরিবারের হৃদয়বিদারক প্রতীক্ষা
নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বলেন, “আমার মেয়েটা ছিল খুব শান্ত, ভদ্র। ওর মতো মেয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারা হলো, এই কষ্ট আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। শুধু চাই, মৃত্যুর আগে ওর হত্যাকারীদের শাস্তি দেখে যেতে পারি।”
ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান বলেন, “বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে, কিন্তু বিচার শেষ হচ্ছে না। আমরা এখনো হুমকি পাই। আমরা শুধু নিরাপত্তা আর ন্যায়বিচার চাই।”
নিরাপত্তা ও সামাজিক চাপ
পরিবারের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসামিপক্ষের লোকজনের হুমকি ও অপপ্রচার এখনো বন্ধ হয়নি। বাড়িতে পুলিশ পাহারা থাকলেও মানসিক চাপ কাটেনি।
এব্যাপারে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মতামত
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মেজবাহ উদ্দিন খাঁন। তিনি বলেন, “এই ধরনের আলোচিত মামলার রায় দ্রুত কার্যকর করা অত্যন্ত জরুরি। বিচার বিলম্বিত হলে অপরাধীরা সাহস পায় এবং সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।”
মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল বলেন, “নুসরাত হত্যাকাণ্ড আমাদের বিচারব্যবস্থার একটি বড় পরীক্ষা। দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে ভুক্তভোগীদের প্রতি অন্যায় হবে এবং সমাজে আইনের প্রতি আস্থা কমে যাবে।”
স্মরণ নয়, ন্যায়বিচারই প্রকৃত শ্রদ্ধা
নুসরাতের মৃত্যুবার্ষিকীতে পরিবারের পক্ষ থেকে দোয়া মাহফিল, কবর জিয়ারতসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। তবে পরিবারের একটাই কথা “স্মরণ নয়, আমরা বিচার চাই।”
নুসরাতের ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসের প্রতীক।

Side banner