গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে টিআর (টেস্ট রিলিফ), কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) ও কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচির আওতায় গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলায় প্রকল্পের কাজ না করেই বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
কালীগঞ্জ উপজেলায় ১৮৯ প্রকল্পে চার কোটি টাকাই লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, প্রকল্প এলাকায় কাজ করা হয়নি, কিন্তু বরাদ্দের অর্থ আগেই তোলা হয়েছে। এমনকি স্থানীয় লোকজন এসব প্রকল্পের বিষয়ে বিস্তারিত কিছুই জানে না।
জানা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িতদের যোগসাজশে একের পর এক বরাদ্দ লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার মোক্তারপুর ইউনিয়নের শিংলাব খালপার থেকে কবিরের বাড়ি মাদরাসা পর্যন্ত সড়কটি মাটি দিয়ে ভরাট করার প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এ জন্য গত ২৫ ফেব্রুয়ারি টিআর কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল দেড় লাখ টাকা। এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখা থেকে। ‘কাজ সম্পন্ন’ দেখিয়ে গত ২৯ জুন তুলে নেওয়া হয় বরাদ্দের অর্থ। গত ৬ আগস্ট সরেজমিনে গিয়ে সড়কটি মাটি দিয়ে ভরাটের আলামত খুঁজে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল মোতালেব ক্ষোভ ঝেড়েই বললেন, সড়কের সঙ্গেই খাল, খালের পাশেই আমার বাড়ি। গত বর্ষায় সড়কের অর্ধেক ভেঙে খালে চলে যায়। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে ইউপি চেয়ারম্যান পলাতক রয়েছেন। এরপর ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয় ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার আইয়ুব বাগমারকে। বাড়িটি খালে বিলীন হওয়া থেকে রক্ষার জন্য সড়কটি মেরামতের উদ্যোগ নিতে তাঁকে অনুরোধ করি।
মাসখানেক আগে তিনি কয়েকজন শ্রমিক দিয়ে ভাঙা স্থানে কয়েক টুকরি মাটি ফেলার ব্যবস্থা করেছিলেন। পরের দিনের বৃষ্টিতে ভরাট সব মাটি খালে চলে যায়। বাধ্য হয়ে বাড়িটি বাঁচাতে নিজের টাকায় ২৩ ট্রাক মাটি কিনে তা ফেলে সড়কের গর্ত ভরাট করেছি। অন্য কেউ এই সড়কে এক কোদাল মাটিও ফেলেনি।
টিআর কর্মসূচির আওতায় উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের দোলনবাজার থেকে সামসুলের দোকান হয়ে কাইয়ুমের বাড়ি পর্যন্ত সড়কে আরসিসি ঢালাইয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল দুই লাখ টাকা। গত ৬ আগস্ট স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে সড়কটি প্রসঙ্গে কথা বললে তারা জানায়, ছয় মাসে ওই সড়কে আরসিসি ঢালাইয়ের কাজ করা হয়নি।
শুধু এই দুই গ্রামীণ সড়কই নয়, গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলায় গত অর্থবছরে কাজ না করেই টিআর, কাবিটা ও কাবিখা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন প্রকল্পে নামমাত্র কিছু কাজ করা হলেও বেশির ভাগ কাজই করা হয়নি। কর্মসূচির কমপক্ষে চার কোটি টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখা সূত্রে জানা গেছে, এসব কর্মসূচির আওতায় ১৮৯টি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ছিল নগদ তিন কোটি ৬৯ লাখ ৪৯ হাজার ১৭২ টাকা এবং ৯৭.৭৬ টন চাল ও ৯৬.৭৬ টন গম। বরাদ্দ করা এই চাল ও গমের মূল্য ধরা হয়েছিল এক কোটি ১০ হাজার ৬২৩ টাকা। সব মিলিয়ে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল চার কোটি ৬৯ লাখ ৫৯ হাজার ৭৯৫ টাকা।
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, এই বরাদ্দের কমপক্ষে চার কোটি টাকাই লোপাট করা হয়েছে। কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, সব প্রকল্পের কাজ গত ৩০ জুনের আগেই শেষ করা হয়েছে। কাজ বুঝে নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতিকে বিলের অর্থ দেওয়া হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আওলাদ হোসেন বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতির কাছ থেকে কাজ বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার। কাজ না করে বিল দেওয়া হলে তার দায়দায়িত্ব তাঁদের। কাজ হয়নি এমন অভিযোগ আমি পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আপনার মতামত লিখুন :