প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া বলেছেন, নির্বাচনী ইশতেহারের ২০টি বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পৃক্ত রয়েছে। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের এসব বিষয় কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা সেক্টর ভিত্তিকভাবে মন্ত্রণালয়ের বিভাগ, অনুবিভাগ, শাখা ও অধিশাখাগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এ ইশতেহার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
বুধবার (১১ মার্চ) প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ৯ম গ্রেড থেকে তদূর্ধ্ব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রবাসী কল্যাণ সচিব বলেন, প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে নির্বাচনী ইশতেহারের যে অংশগুলো এই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, সেগুলো নিয়ে কর্মপরিকল্পনাসহ একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। শিগগিরই তা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে। ইশতেহারের আলোকে করণীয় বিষয়ে একটি প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনাও প্রস্তুত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়ার পর এটি চূড়ান্ত করা হবে। পরে মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট ইশতেহার বাস্তবায়নের চূড়ান্ত কর্মপরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে।
সচিব বলেন, সরকারের ইশতেহার বাস্তবায়নে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোকে আরও সক্রিয় হওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে টেলিফোন ও ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিদেশের বিভিন্ন শ্রমকল্যাণ উইংয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে।
নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন—অর্থের চেয়ে মানুষের জীবনের মূল্য অনেক বেশি। মানুষের জীবনই সবচেয়ে অগ্রগণ্য বিষয়। তাই যেকোনো পরিস্থিতিতে, যত খরচই হোক না কেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হবে, তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনে তাদের দেশে পাঠানোর ব্যবস্থাও করা হবে।
তিনি আরও বলেন, দুর্ভাগ্যবশত যদি কোনো প্রবাসী কর্মীর মৃত্যু হয়, তাহলে তার মরদেহ যত দ্রুত সম্ভব দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সে অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সচিব বলেন, নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী কার্যক্রম গ্রহণের জন্য বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোর শ্রম উইংকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যেসব শ্রমিক অনথিভুক্ত (আনডকুমেন্টেড), তাদের ডকুমেন্টেড করা, বিপদাপন্ন শ্রমিকদের সহায়তা করা, যাদের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা রয়েছে তাদের আইনি সহায়তা দেওয়া, বিদেশে কর্মহীন শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এবং অসুস্থ শ্রমিকদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে তাদের নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখার কথাও বলা হয়েছে।
তিনি জানান, বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর শ্রম উইংয়ের অধীনে বর্তমানে তিনটি কল্যাণ কেন্দ্র (ওয়েলফেয়ার সেন্টার) ও তিনটি সেফ হাউস রয়েছে। এগুলোকে আরও সক্রিয় ও সেবামুখী করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেসব মিশনে স্থানীয় জনবলের ঘাটতি রয়েছে, সেসব স্থানে জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং আরও নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।
তিনি বলেন, যেসব দেশে যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে, সেসব দেশের শ্রম উইংয়ের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ সচিব আরও বলেন, ইরান সংকটকে কেন্দ্র করে মন্ত্রণালয়ের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ চালু রয়েছে। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির তাৎক্ষণিক তথ্য ও আপডেট পাওয়া যাচ্ছে এবং সেই অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডেরও একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন দেশে কর্মরত কাউন্সিলর, ফার্স্ট সেক্রেটারি ও সেকেন্ড সেক্রেটারিরা—বিশেষ করে শ্রম কল্যাণ উইংয়ের কর্মকর্তারা—সদস্য হিসেবে যুক্ত আছেন। তাদের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রম উইং থেকে নিয়মিত সর্বশেষ তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং সে অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সচিব বলেন, ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের একটি হটলাইন নম্বর (+৮৮০৯৬১০১০২০৩০) চালু রয়েছে। এ নম্বরে দেশে থাকা প্রবাসীদের আত্মীয়-স্বজনরা তথ্য দিলে তার ভিত্তিতেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে দুইজন কর্মকর্তাকে ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একজন মহাপরিচালক এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জাপান সেলের একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রতিদিন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, কোথায় কে আহত বা নিহত হচ্ছেন এসব বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে মন্ত্রী এবং প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর পর্যায়েও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সচিব বলেন, যেসব এলাকায় যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে শ্রমিকরা আটকে পড়েছেন, তাদের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কিছু দেশ থেকে প্রবাসীদের দেশে ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বাহরাইন থেকে বর্তমানে বাংলাদেশে ফ্লাইট বন্ধ থাকায় সেখান থেকে লোকজন আনা যাচ্ছে না। তবে সৌদি আরবে নিহত দুই বাংলাদেশির মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠানোর জন্য দূতাবাসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে সরকার সম্পূর্ণ সজাগ রয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের হটলাইন ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে। এছাড়া প্রবাসী কল্যাণ ভবনে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে, যেখানে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সচিব জানান, যেসব মিশনে কর্মকর্তা নিয়োগ প্রয়োজন, সেখানে কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য ইতোমধ্যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। ১৭টি পদের বিপরীতে ৬১০ জন আবেদন করেছেন। মিশনগুলোকে আরও শ্রমিকবান্ধব ও সক্ষম করে তুলতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এসব জনবল নিয়োগের কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।








































আপনার মতামত লিখুন :