দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতুতে চালু রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত এক পাসপোর্ট প্রকল্প। বিনিয়োগের বিনিময়ে নাগরিকত্ব (সিবিআই) শীর্ষক এই কর্মসূচি সাধারণত ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ নামে পরিচিত। ওই কর্মসূচির আওতায় দেশটিতে বিনিয়োগের বিনিময়ে ধনাঢ্য বিদেশিরা ভানুয়াতুর নাগরিকত্ব অর্জনের সুযোগ পান।
এই কর্মসূচি কীভাবে পরিচালনা করা হয়?
বিনিয়োগ অভিবাসন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল রেসিডেন্স ইনডেক্সের (জিআরআই) বলছে, বিশ্বের দ্রুততম ও সবচেয়ে সহজ সব সিবিআই কর্মসূচির একটি পরিচালনা করে ভানুয়াতু। আবেদনকারীদের একেবারে সীমিত নথিপত্র জমা দিতে হয়; যা সম্পূর্ণ ডিজিটাল মাধ্যমেই দেওয়া যায়। পুরো প্রক্রিয়ার কোনও পর্যায়েই আবেদনকারীদের দেশটিতে সরাসরি উপস্থিত থাকতে হয় না।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাবেন যেভাবে
ভানুয়াতুর নাগরিকত্ব পেতে খরচ পড়ে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫০০ থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার (প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ থেকে ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা)। চার সদস্যের এক পরিবারের জন্যও দেশটিতে এই সুবিধা রয়েছে। সাধারণত আবেদন প্রক্রিয়া শেষ হতে ৩০ থেকে ৬০ দিন সময় লাগে। ২০১৯ সালে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশটির মোট রাজস্বের প্রায় ৩০ শতাংশই আসে পাসপোর্ট বিক্রি থেকে।
কী কী সুবিধা পাওয়া যায়?
দ্রুত ও সহজ প্রক্রিয়ার বাইরে ভানুয়াতুর এই কর্মসূচির আরও কিছু উল্লেখযোগ্য সুবিধা রয়েছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভানুয়াতুর পাসপোর্টধারীরা ১১৩টি দেশে ভিসা ছাড়াই অথবা ভিসা অন অ্যারাইভাল সুবিধায় প্রবেশ করতে পারতেন।
বৈশ্বিক পাসপোর্ট সূচক নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান হেনলি পাসপোর্টের সূচকে ১৯৯টি পাসপোর্টের মধ্যে ভানুয়াতুর অবস্থান ৫১তম। সৌদি আরব, চীন ও ইন্দোনেশিয়ার চেয়েও এগিয়ে রয়েছে দেশটি।
কানাডার ভিসা পাবেন যেভাবে
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুবিধা হারিয়েছে ভানুয়াতুর পাসপোর্ট। নাগরিকত্ব কর্মসূচি ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে ২০২২ সালের মার্চে ইউরোপীয় কাউন্সিল এই সুবিধা স্থগিত করে; যা ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্থায়ী করা হয়।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এই দ্বীপরাষ্ট্রটি কার্যত করস্বর্গ হিসেবে পরিচিত। দেশটিতে ব্যক্তিগত আয়কর, মূলধনের মুনাফা কর, উত্তরাধিকার কর কিংবা সম্পদ কর দেওয়ার কোনও বিধান নেই। তবে ভ্যাট ও সম্পত্তি লেনদেন করের মতো কিছু পরোক্ষ কর থাকলেও সেগুলো দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। তুলনামূলক শিথিল আইনি বাধ্যবাধকতা ও কর অব্যাহতির সুযোগই দেশটিকে কৌশলগত দিক থেকে বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে ভানুয়াতুর মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হার ছিল মাত্র ৩ হাজার ৫১৫ দশমিক ২ মার্কিন ডলার। ফলে অফশোর আর্থিক সেবা দেশটির আয়ের একটি বড় উৎস হিসেবে রয়ে গেছে এবং করবান্ধব অবস্থান বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
বাড়ছে বিতর্ক
গত কয়েক বছরে দুর্নীতি ও আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের অপব্যবহারের অভিযোগে ভানুয়াতুর নাগরিকত্ব কর্মসূচি ঘিরে তীব্র সমালোচনা দেখা গেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানে ২০২০ সালে ইস্যু করা দুই হাজারের বেশি গোল্ডেন পাসপোর্ট পর্যালোচনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই পাসপোর্ট যারা পেয়েছিলেন তাদের মধ্যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা এক সিরীয় ব্যবসায়ী, উত্তর কোরিয়ার এক সন্দেহভাজন রাজনীতিক, ভ্যাটিকানে চাঁদাবাজির অভিযোগে অভিযুক্ত এক ইতালীয় ব্যবসায়ী, অস্ট্রেলিয়ার একটি মোটরসাইকেল গ্যাংয়ের সাবেক সদস্য এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ৩৬০ কোটি ডলারের এক ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই ভাইও ছিলেন।
বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ভানুয়াতুর এই কর্মসূচি অপব্যবহারের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং এটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাজ্যে প্রবেশের বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। একই সঙ্গে ভানুয়াতুর করব্যবস্থা অর্থপাচারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ইউএনবি।








































আপনার মতামত লিখুন :