ধর্ম, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক মিল থাকায় ঐক্য ছিল আফ্রিকান দুই ফুটবল পরাশক্তি সেনেগাল ও মরক্কোর মাঝে। ফুটবলের কারণে তাদের সেই সম্পর্কে চিড় ধরেছে। গত জানুয়ারিতে আফ্রিকা কাপ অব নেশন্সের শিরোপা জিতেছিল সেনেগাল। কিন্তু দুই মাস পর কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবলের (সিএএফ) আপিল বিচারকরা তাদের সেই জয় বাতিল করে মরক্কোকে বিজয়ী ঘোষণা করেছে। ফলে উভয় দেশের দ্বন্দ্ব এখন বিস্তৃত হয়েছে কূটনৈতিক পর্যায়ে।
গত ১৮ জানুয়ারি রাবাতের ফাইনালে কোচ পাপে থিয়াওর নেতৃত্বে সেনেগাল খেলোয়াড়রা স্টপেজ টাইমে প্রতিবাদ জানিয়ে ১৫ মিনিট মাঠের বাইরে ছিল। ভক্তরাও মাঠে ঢোকার চেষ্টা করেছিল। মূলত মরক্কোকে পেনাল্টি দেওয়ার সিদ্ধান্তে ওই বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি। ওই সময় পর্যন্ত দুই দলের স্কোর ছিল গোলশূন্য। লম্বা সময় পর মাঠে ফেরে সেনেগাল। যখন খেলা শুরু হয়, তখন মরক্কো ফরোয়ার্ড ব্রাহিম দিয়াজের স্পটকিক রুখে দেন সেনেগালিজ গোলকিপার এদুয়ার্দো মেন্দি এবং এরপর অতিরিক্ত সময়ে তারা ম্যাচের একমাত্র গোলটি করেন।
এর আগেই মাঠে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, মরক্কোকে পেনাল্টি দেওয়ার কয়েক মিনিট আগেই সেনেগালের একটি গোল বাতিল করা হয়। স্টপেজ টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে গোলটি বিল্ডআপের সময় হওয়া আব্দুলায়ে সেকের ফাউলের কারণে বাতিলের সিদ্ধান্ত জানান রেফারি। যদিও টিভি রিপ্লেতে দেখা গেছে মরক্কো ডিফেন্ডার আশরাফ হাকিমির সঙ্গে তার ছোঁয়া লেগেছে সামান্য। সেই উত্তেজনা আরও চরমে উঠে পরবর্তীতে মরক্কোকে পেনাল্টি দেওয়ায়। সেই ঘটনা এখন অতীত, ১-০ গোলে জিতে সেনেগাল উদযাপনে মাতার দুই মাসও পেরিয়ে গেছে।
সংবাদ সংস্থা এপি বলছে, ফাইনালে সৃষ্ট ঘটনার রেশ ছিল এতদিন পর্যন্ত। প্রাথমিক শাস্তিমূলক শুনানিতে সিএএফ ১০ লাখ ডলারের বেশি জরিমানা আরোপ করেছিল সেনেগালকে। একইসঙ্গে সেনেগাল ও মরক্কোর খেলোয়াড় এবং অফিসিয়ালদেরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। কিন্তু ফলাফল অপরিবর্তিত ছিল। আপিল বোর্ড সেই রায় বদলে দিয়েছে। সেনেগালকে ফাইনালের অযোগ্য দল ঘোষণা করে তাদের ১-০ গোলের জয় পরিবর্তন করে ৩-০ ব্যবধানে জয়ী রায় দিয়েছে মরক্কোকে।
এই সিদ্ধান্তে মরক্কোতে উদযাপন শুরু হলেও সেনেগালে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। দেশটির সরকার আপিল বোর্ডের সিদ্ধান্তকে ‘অন্যায্য’ আখ্যা দিয়ে তা বাতিলে আইনি লড়াই চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। একইসঙ্গে সিএএফ–এর ভেতরে ‘সম্ভাব্য দুর্নীতি’ তদন্তের দাবি তুলেছে দেশটি। বিপরীতে সেনেগালের পক্ষ থেকে ওঠা পক্ষপাতিত্ব ও দুর্নীতির অভিযোগ নাকচ করেছেন সিএএফ সভাপতি প্যাট্রিস মোটসেপে। তিনি বলেন, ‘আফ্রিকার কোনো দেশকেই অন্য দেশের তুলনায় বেশি সুবিধা বা অগ্রাধিকার দেওয়া হবে না।’
এদিকে, মরক্কো ও সেনেগালের মধ্যে দীর্ঘদিনের ধর্মীয়, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ছিল। কিন্তু বর্তমান উদ্ভুত পরিস্থিতিতে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। সুফি মুসলিম নেতা তিজানিয়াহ’র বিধান অনুসরণ করত উভয় দেশই। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে মরক্কোর ব্যাংক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক বিনিয়োগ রয়েছে সেনেগালের অর্থব্যবস্থা ও কৃষি খাতে। সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের নানা প্রোগ্রাম, অভিবাসন ও যৌথ উৎসবও করে উভয় দেশ।
তবে ফাইনালে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে গ্রেপ্তার ১৯ সেনেগালিজ সমর্থককে মরক্কোর আদালত এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেয়, যা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সেনেগাল সরকার। রাজধানী ডাকার–এর এক শিক্ষার্থী মারিয়ামা এনদিয়ে বলেন, এই সিদ্ধান্ত মরক্কোর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক করেছে। ডাকার-এ অবস্থিত মরক্কোর দূতাবাস দেশটিতে থাকা মরক্কোর নাগরিকদের সংযত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, ‘এটি কেবল একটি খেলা, এর ফলাফল কোনোভাবেই উত্তেজনা বা বিরূপ মন্তব্যের কারণ হওয়া উচিত নয়।’
মরক্কোর বৃহৎ শহর ক্যাসাব্লাঙ্কার ব্যবসায়ী ইসমাইল ফনানির মতে– ‘ফাইনালে অন্যান্য আফ্রিকান দেশগুলো মরক্কোর বিপক্ষে ছিল বলে তার মনে হয়েছে।’ একই শহরের মুদি দোকানকর্মী মোহাম্মদ এল আরাবি বলেন, ‘এভাবে শিরোপা পাওয়ায় তিনি খুশি নন এবং শিরোপাটি সেনেগালের কাছেই থাকা উচিত ছিল। এখানকার মানুষ সেনেগালিজদের ঘৃণা করা শুরু করেছে। তাদের সহায়তা করতে রাজি নয়। অথচ আমরা মুসলিমরা পরস্পর ভাই-ভাই ছিলাম, এখন সেই পরিস্থিতি নেই।’








































আপনার মতামত লিখুন :