গৌরবের ইতিহাস না কি দাসত্বের উত্তরাধিকার?
স্মৃতির পাতা উল্টালে আমাদের ফিরে যেতে হয় ১৮৫৮ সালে। সিপাহি বিদ্রোহের উত্তাপ তখনো ভারতজুড়ে স্তিমিত হয়নি। সেই বছর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রথমবারের মতো এন্ট্রান্স পরীক্ষা (বর্তমান এসএসসি বা সমমান) শুরু হয়। সেই সময় থেকেই উপমহাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য পাসের ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারিত হয় ৩৩ শতাংশ। লোকমুখে প্রচলিত আছে, ব্রিটিশ রাজপুরুষেরা মনে করতেন ভারতীয়দের মেধা ইউরোপীয়দের তুলনায় অর্ধেক, তাই লন্ডনের ৬৫ নম্বরকে অর্ধেক করে (৩২.৫) রাউন্ড ফিগারে ৩৩-এ নামিয়ে আনা হয়েছিল। এই নীতির অনুসরণে আজও প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বা সাধারণ বোর্ড পরীক্ষায় ন্যূনতম পাস নম্বর ৩৩ প্রচলিত আছে, যা ‘ডি’ গ্রেড দিয়ে প্রকাশ করা হয়। এর কম পেলে পরীক্ষায় ফেল আসে। উচ্চশিক্ষার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় পাসের ন্যূনতম মানদণ্ড মাত্র ৩০ নম্বর হওয়াটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভঙ্গুর দশাকেই উন্মোচিত করে।
আজ ২০২৬ সাল। ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে ১৬৮টি বছর ঝরে গেছে। গঙ্গা-পদ্মা দিয়ে বয়ে গেছে কত জল! অথচ আমরা আজও সেই ঔপনিবেশিক মানসিকতার ‘৩৩’ নম্বরকে পরম মমতায় আঁকড়ে ধরে আছি। যে ৩৩ ছিল ব্রিটিশদের চোখে আমাদের ‘অযোগ্যতার সার্টিফিকেট’, তাকেই আমরা আজ আমাদের সফলতার মাপকাঠি বানিয়ে রেখেছি। প্রশ্ন জাগে, ১৬৮ বছর আগের সেই অবমাননাকর মাপকাঠি কি আজও আমাদের মেধাকে মূল্যায়ন করার সঠিক মানদণ্ড?
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?
বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় ‘৩৩’ একটি হাস্যকর সংখ্যা। উন্নত বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই পাসের ন্যূনতম মানদণ্ড ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডায় ‘ডি’ গ্রেড পেতে হলেও একজন শিক্ষার্থীকে অন্তত ৬০ শতাংশ নম্বর অর্জন করতে হয়। ইউরোপের দেশগুলোতে ৫০ শতাংশের নিচে নম্বর পাওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষার্থীর মৌলিক দুর্বলতা রয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়।
এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভুটানেও পাসের মানদণ্ড ৫০ শতাংশ। চীনে এই হার ৬০ শতাংশ। আমরা যখন বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের বাজারে আমাদের সন্তানদের পাঠাচ্ছি, তখন ৩৩ শতাংশ নম্বরধারী একজন গ্র্যাজুয়েট আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্রেফ ‘অনুত্তীর্ণ’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। তথ্যের অবাধ প্রবাহের এই যুগে আমাদের পাসের মানদণ্ড বৈশ্বিক গড় মানের চেয়ে নিচে থাকা মানেই হলো আমরা স্বেচ্ছায় নিজেদের পিছিয়ে রাখছি।

কেন এখন পরিবর্তনের সময়?
অনেকেই যুক্তি দেন, আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা কি পাস নম্বর বাড়ানোর মতো উন্নত হয়েছে? উত্তর হলো, অবশ্যই হয়েছে। প্রযুক্তির ছোঁয়া বা তথ্য বিপ্লব বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের চিত্র বদলে দিয়েছে। আজকের একজন শিক্ষার্থীর হাতে স্মার্টফোন মানেই তার পকেটে আস্ত একটি লাইব্রেরি। ইউটিউব, অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কল্যাণে জ্ঞান এখন আর কেবল শহরের অভিজাত স্কুলের চার দেয়ালে বন্দি নেই।
বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পথে! আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন এবং প্রযুক্তির প্রসারের ফলে ৩৩ নম্বর পাওয়া এখন আর কোনো কৃতিত্বের বিষয় নয়। বরং এই নিম্ন মানদণ্ড মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের ‘আত্মতুষ্টি’ তৈরি করছে। যখন লক্ষ্যবস্তু নিচে থাকে, তখন তীরের গতিও কমে যায়। পাসের মানদণ্ড ৫০ শতাংশ করা হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অজানাকে জানার ক্ষুধা বাড়বে, তারা গভীর থেকে শিখবে এবং কেবল পাস করার জন্য নয়, বরং দক্ষ হওয়ার জন্য লড়াই করবে।
”পাসের জন্য ৩৩ শতাংশ নম্বর কেবল একটি সাধারণ সংখ্যা নয়; এটি ১৬৮ বছরের পুরনো এক মেধা-দাসত্বের শৃঙ্খল এবং ব্রিটিশ বর্ণবাদী শাসনের অবমাননাকর উত্তরাধিকার। তথ্যের অবাধ প্রবাহ আর প্রযুক্তির এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত বৈশ্বিক শ্রেষ্ঠত্ব, কলোনিয়াল আমলের ‘অযোগ্যতার সার্টিফিকেট’ আঁকড়ে পড়ে থাকা নয়। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ভিশন সফল করতে হলে শিক্ষার মানদণ্ডকে অতীতের অন্ধকার গলি থেকে বের করে বৈশ্বিক ৫০ শতাংশের আলোতে নিয়ে আসতেই হবে। নীতিনির্ধারকদের এই বোধোদয়ের অপেক্ষায় আজ পুরো জাতি।”
শিক্ষানীতির নীরবতা ও নীতিনির্ধারকদের দায়
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষানীতিসমূহ কিংবা পরবর্তী বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাবে এই ‘পাস মার্ক’ পরিবর্তনের বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে পাবলিক পরীক্ষায় ন্যূনতম পাস নম্বর ৪০ করার প্রস্তাব ছিল, যা ২০১৯ সালে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও আজও তা আলোর মুখ দেখেনি। আমাদের নীতিমালায় পাসের হার বাড়ানোর ওপর যতটা জোর দেওয়া হয়েছে, পাসের গুণগত মান বাড়ানোর ওপর ততটা নয়। পাসের হার শতভাগ হওয়া আনন্দের, কিন্তু সেই পাসের ভিত্তি যদি হয় মাত্র ৩৩ নম্বর, তবে তা জাতির জন্য এক ধরনের মেধাগত দেউলিয়াত্ব ডেকে এনেছে, যা এখন গলার কাঁটা!
তাই এখনই সময় শিক্ষানীতিতে আমূল পরিবর্তন আনা। নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে যে, ১৬৮ বছর আগের একটি প্রশাসনিক আদেশ আজ আমাদের জাতীয় উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো জাতির উন্নয়ন কেবল সুউচ্চ অবকাঠামো দিয়ে সম্ভব নয়; তার জন্য প্রয়োজন সৃজনশীল ও দক্ষ জনশক্তি। আর সেই দক্ষতা নিশ্চিত করার প্রথম ধাপ হলো পাসের মানদণ্ডকে আধুনিক ও বৈশ্বিক মানে উন্নীত করা। বৈশ্বিক মানদণ্ডে উপনীত হওয়ার জন্য সময়ের পরিক্রমায় ন্যূনতম পাস নম্বর ৫০ বাস্তবায়ন করতে যত সময়ক্ষেপণ হবে, ততই আমরা জাতিগতভাবে পিছিয়ে থাকব।
রূপান্তরের ঝুঁকি ও উত্তরণের পথ
অবশ্যই যেকোনো বড় পরিবর্তনের সাথে কিছু ঝুঁকি জড়িয়ে থাকে। পাসের নম্বর হুট করে ৫০ করলে প্রাথমিক পর্যায়ে অকৃতকার্য হওয়ার হার বা ‘ড্রপ আউট’ বাড়তে পারে। বিশেষ করে মফস্বল বা দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীরা যারা পর্যাপ্ত শিক্ষক বা ল্যাবরেটরি পায় না, তাদের জন্য এটি পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
তবে এই ঝুঁকি এড়ানোর পথ হলো ‘সমন্বিত বাস্তবায়ন’। এটি রাতারাতি না করে ধাপে ধাপে করা যেতে পারে। প্রথম বছর ৩৫, তারপরের বছর ৪০, এভাবে আগামী ৫ বছরের মধ্যে আমরা ৫০ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারি। একই সাথে সরকারকে প্রান্তিক পর্যায়ে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং ডিজিটাল লার্নিং টুলস নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কেবল ফেল করার ভয়ে আমরা মানহীন শিক্ষার পথে হাঁটতে পারি না। অস্ত্রোপচারে কিছুটা রক্তক্ষরণ হয় সত্য, কিন্তু তা জীবন বাঁচানোর জন্যই অনিবার্য। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অভিন্ন গ্রেডিং নীতিমালা অনুযায়ী ন্যূনতম পাস মার্ক ৪০% যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক ও প্রাইভেট সকল বিশ্ববিদ্যালয় অনুসরণ করে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ও মাস্টার্স পরীক্ষায় বর্তমানে তত্ত্বীয় এবং ইনকোর্স মিলে ন্যূনতম পাস নম্বর ৪০% এর প্রচলন এবং মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস পাসের ক্ষেত্রে ন্যূনতম পাস নম্বর ৬০% অন্তত কিছুটা আশা জাগায়।
৩৩ নম্বর কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের শিক্ষার দীনতার প্রতীক। এটি সেই অদৃশ্য শিকল, যা ১৬৮ বছর ধরে আমাদের সৃজনশীলতাকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। প্রযুক্তির এই মাহেন্দ্রক্ষণে, যখন বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমরা মহাকাশে উপগ্রহ পাঠাচ্ছি, তখন আমাদের শিক্ষার মানদণ্ড ব্রিটিশ আমলের অন্ধকার গলিতে পড়ে থাকতে পারে না।
আসুন, ৩৩ এর এই দাসত্ব থেকে আমরা বেরিয়ে আসি। আসন্ন শিক্ষা সংস্কারে ন্যূনতম পাসের নম্বর ৫০ করার প্রস্তাবটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হোক। আমাদের সন্তানদের পঙ্গু মেধা নয়, বরং বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মতো শক্তিশালী ভিত্তি দান করুন। ১৬৮ বছরের জড়তা ভেঙে আজ নতুন ভোরের সূচনা হোক। ৩৩ থেকে ৫০-এ পাসের মানদণ্ড উন্নীত করা শুধুমাত্র একাডেমিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি আত্মমর্যাদা ও মানসম্মত শিক্ষার পথে একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এবং পাবলিক পলিসি অ্যানালিস্ট।








































আপনার মতামত লিখুন :