কোমলমতি শিশুরা ফুলের মতো। এরা নিষ্পাপ, স্নিগ্ধ, নির্মল, সুন্দর। এরা চাঁদ-সূর্য-তারার মতো সত্য, বাস্তব। শিশুরা ষড়যন্ত্র চেনে না।
শত্রুতা বোঝে না। এরা কালোকে কালো বলে আর সাদাকে বলে সাদা। আমি বিশ্বাস করি, এই অপার্থিব মায়াময় শিশুরা যদি তাদের মনের ভেতরের এই চিরন্তন গুণাবলি আর সৌন্দর্য ধরে রেখে নিজেদের সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিনাশী ও সাহসী করে গড়ে তুলতে পারে, তাহলে তারাই হবে আগামীর সুস্থ ও সুন্দর পৃথিবীর রূপকার। এদের হাত ধরেই তৈরি হবে জাতির আদর্শ ও মূল্যবোধের সৃজনশীল ও টেকসই কাঠামো।
এরা যদি সব ভালো কাজের জন্য মনের জানালা উন্মুক্ত রাখে, তাহলে এরাই তৈরি করবে বাসযোগ্য বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। এদের দরকার উদার, মুক্ত পরিবেশ আর উৎসাহ।
শিশুদের এই অমিত সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই আমি তাদের জন্য একটি ছোট্ট আয়োজনের কথা ভেবেছি। আমার ধারণা, এমন একটি আয়োজন করা হবে, যেখানে তারা কিছুক্ষণের জন্য হলেও নিজেরাই নিজেদের মেলে ধরবে, মনের ইচ্ছার যত রং আছে, ক্যানভাসে মন খুলে তারা ফুটিয়ে তুলবে সম্ভাবনার শতফুল।
দেখা না-দেখা দেশ, মাটি আর মানুষের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে কল্পনার রঙে সাজাবে। এটাই ছিল আমার চাওয়া।
আর এই চাওয়া থেকে বসুন্ধরা গ্রুপের অনন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষকে বললাম, তারা যেন এমন একটি আয়োজন করে, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিশুরা আসবে, ছবি আঁকবে, নিজেদের ভাবনা ফুটিয়ে তুলবে। এমন একটি আয়োজন করবে, যা বিষয়বৈচিত্র্যে আর বিশালত্বে সেরা, অনন্য। এটাও বললাম, তাদের এই আয়োজনটি যেন আমাদের ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা ঘিরে হয়।
যেন শিশুরা তাদের কল্পনাশক্তি দিয়ে আজ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক আগের একটি অনিবার্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বাস্তবতা ও পরিণতি তুলে ধরতে পারে।
একই সঙ্গে এ-ও বলেছি, তারা যেন রক্তাক্ত চব্বিশে তরুণদের আত্মত্যাগও তাদের রংতুলিতে চিত্রায়িত করে। একটি যেমন আমাদের জাতীয় জীবনের অনিবার্য-অতুলনীয় ঘটনা, তেমনি আরেকটি ঘটনাও মানুষের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা একটি দেখেনি, হয়তো জেনে থাকবে কিভাবে বাংলাদেশ নামের একটি দেশের জন্ম হলো। ওরা হয়তো জেনে থাকবে এ দেশের কামার-কুমার, জেলে-তাঁতি, কৃষক-শ্রমিকরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে কিভাবে বাংলাদেশ নামের মানচিত্র ছিনিয়ে এনেছেন হানাদার বাহিনীর কবল থেকে। তাই তারা নিজেদের কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতা দিয়ে সেই সময়, যুদ্ধ ও লাখো মানুষের আত্মত্যাগকে আঁকবে। একটি দেশের স্বাধীন হওয়ার না-দেখা ঐতিহাসিক ঘটনা তাদের বোধ ও মনোজগতে কতটা স্পষ্ট, তা যেমন তারা নিজেদের মতো করে তুলে ধরার সুযোগ পাবে, তেমনি একটি সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া গণ-আন্দোলন, যেখানে তারা অনেকেই সরাসরি অংশ নিয়েছে অথবা দেখেছে, জেনেছে—সেটিকে কিভাবে ধারণ করে তা-ও চিত্রায়িত করার সুযোগ পাবে। আমার ধারণা, আয়োজকরা আমার ইচ্ছা যথাযথভাবে বাস্তবায়নে কাজ করতে পেরেছে।
গত ১২ ডিসেম্বর প্রতিযোগিতাটি সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় ১০ হাজার শিশু এ প্রতিযোগিতায় নিবন্ধন করেছে জেনে আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও অভিভূত হয়েছি। আমার একটি ছোট্ট চিন্তা ঘিরে আয়োজিত এমন অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো শিশু ও তাদের অভিভাবকদের এমন সাড়া সত্যিই অভাবনীয়। তাদের একটি বড় অংশ সশরীরে আমাদের বসুন্ধরা পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাস এবং পাশের বসুন্ধরা স্পোর্টস সিটিতে মা-বাবার হাত ধরে ছবি আঁকতে এসেছে—এই খবর ও ছবি দেখে আমার যে কী ভালো লেগেছে, সেটা বলে বোঝানো যাবে না! শিশুরা মেঝেতে বসে তাদের ছড়ানো-ছিটানো রংতুলি আর ক্যানভাসে আপন মনে ছবি আঁকছে এমন অনিন্দ্যসুন্দর দৃশ্য আমার ভেতরেও দারুণ আশা জাগিয়েছে।
আমার মনে হয়েছে, এই প্রজন্ম শুধু ডিভাইসেই পড়ে থাকে না, তারা শুধু বিদেশি গেমস আর সোশ্যাল মিডিয়ায় বুঁদ হয়ে থাকে না, সুযোগ করে দিলে এরাও দেখাতে পারে তাদের ভেতরেও আছে অমিত সম্ভাবনার সীমাহীন ভাণ্ডার। আরো ভালো লেগেছে এই ভেবে যে এটিই দেশে এত বড় পরিসরে এমন আয়োজন। বসুন্ধরা গ্রুপও গর্বিত শিশুদের জন্য প্রেরণাদায়ক এমন প্রতিযোগিতার সুযোগ করে দিতে পেরে। আরো বড় বিষয় হলো, এই প্রতিযোগিতায় যাঁরা বিচারক হয়ে এসেছিলেন, তাঁরা দেশসেরা তো অবশ্যই, অনেকের খ্যাতি আবার বিশ্বজোড়া। তাঁরা এই আয়োজনে সাড়া দিয়েছেন বলে আমি তাঁদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এর মধ্য দিয়ে শিশুরাও দেশসেরা শিল্পীদের কাছ থেকে দেখার এবং তাঁদের অনুপ্রেরণা পাওয়ার সুযোগ পেল। এটাই হয়তো কোনো শিশুর জীবন বদলে দিতে পারে!
জানলাম, ছবি আঁকায় দেড় শর মতো প্রতিযোগী পুরস্কার পাচ্ছে। দেশসেরা চিত্রশিল্পীরা যাঁরা বিচারক হিসেবে ছিলেন, তাঁরা হয়তো ছবির মান বিচার করে কাউকে কাউকে বিজয়ী করবেন। কিন্তু আমার চোখে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া সবাই বিজয়ী! এরা যে হাজার হাজার ছবি এঁকেছে, এদের কচি হাতের স্পর্শে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা এবং চব্বিশের গণ-আন্দোলনের যেসব অমূল্য ছবি তৈরি হয়েছে, এর মূল্য যেকোনো পুরস্কারের চেয়ে কম নয়। আমি মনে করি, এগুলো শুধুই ছবি নয়, বরং আগামী এই প্রজন্মের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি, বুদ্ধিমত্তা, আদর্শ, মূল্যবোধ থেকে উৎসারিত একেকটি ছবি তাদের উন্নত, আধুনিক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হয়ে ওঠার পাঠপর্বও। তাদের মা-বাবারাও শিশুদের এই আগ্রহে সঙ্গী হয়েছেন বলে তাঁরাও এক অর্থে আগামীর সুন্দর পৃথিবী বিনির্মাণের সারথি। তাঁদের প্রতিও আমার সালাম।
সত্যিকার অর্থে, যারা আজ বিজয়ী হিসেবে পুরস্কার নেবে, আমি তাদের অবশ্যই অভিনন্দিত করছি। তারা এখানকার সব প্রতিযোগীর মধ্যে নিঃসন্দেহে সেরা। তাদের আঁকা ছবি বিচারকদের চোখে সেরা হয়েছে শিল্পমান ও নানা সূচক বিবেচনায়। এই বিচার করার ক্ষমতা আমার নেই। তারা অবশ্যই এ পুরস্কার পাওয়ার মধ্য দিয়ে অনেক দূর যাবে। আরো সফল হবে—এই বিশ্বাসও আমার রয়েছে। আমি চাই, সামনে তারা তাদের সৃজনশীল কাজ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিশ্ব জয় করুক।
একই সঙ্গে যারা পুরস্কার পায়নি, তাদের প্রতিও আমার সমান অভিনন্দনবার্তা। তারা হয়তো এখানে বিজয়ী হতে পারেনি, কিন্তু তারা ঠিকই কোথাও না কোথাও তাদের সেরাটা দিতে পারবে। এখানকার প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার যে উৎসাহ ও উদ্যম, ঠিকই তা একদিন তাদের আরো উঁচু স্তরের কোনো প্রতিযোগিতায় সেরার মর্যাদা এনে দেবে। আমার জীবন থেকেই আমি বুঝি, মনে-প্রাণে কোনো কাজে লেগে থাকলে, আর সততা-একনিষ্ঠতার সঙ্গে কাজ করলে জীবনে সফলতা আসবেই। তাই তারাও একদিন সফল হবেই।
আজকের এ মহতী আয়োজনের এই পর্যায়ে আপনাদের আরো জানাতে চাই, বসুন্ধরা পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ এ রকম ভালো কাজ অব্যাহত রাখবে। বিশেষ করে এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রতিবছরই বিজ্ঞান, গণিত, ভাষা-কৃষ্টি বা এ ধরনের বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করবে। এর ব্যাপ্তি বাড়ানোর মধ্য দিয়ে দেশবাসীকে আমরা এই বার্তা দিতে চাই, অনেক রক্ত আর আত্মত্যাগে অর্জিত বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা থামবে না। একে এগিয়ে নিতেই হবে। নতুন প্রজন্ম হলো দেশের আগামীর সম্ভাবনা। তাদের চতুর্থ শিল্প বিপ্লব কিংবা এআই প্রযুক্তিনির্ভর করে প্রস্তুত করতে হলে সব ধরনের সহপাঠ্যক্রমিক বিষয়েও সমান পারদর্শী হতে হবে। বসুন্ধরা গ্রুপ সামনে থেকে এসব কর্মকাণ্ডে সহায়তা করে যাবে।
আপনারা সবাই নিশ্চয় জানেন, বসুন্ধরা গ্রুপ দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্প গ্রুপ, যা দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এই গ্রুপ বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানসহ দেশের অর্থনীতিতে গতিসঞ্চার করছে। আমদানি-রপ্তানি, উৎপাদন ও সেবা খাতে বিশাল কর্মযজ্ঞ এই গ্রুপটির কয়েক ডজন প্রতিষ্ঠানের। এর পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে বিভিন্ন সময়ই এ রকম সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের আয়োজন করে থাকে বসুন্ধরা গ্রুপ ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্য দিয়ে আমাদের একমাত্র ও প্রধান অগ্রাধিকারই হলো—সবার আগে বাংলাদেশ। এই দেশ যদি উন্নত হয়, তাহলেই বিশ্বদরবারে জাতি হিসেবে আমাদের মর্যাদা বাড়বে। আমরা সবার সমীহ অর্জন করব। আর এ জন্য যত প্রতিকূলতাই থাকুক না কেন, বসুন্ধরা গ্রুপ দেশ ও মানুষের জন্য যা কিছু ভালো, তার সঙ্গে সব সময় ছিল, আছে এবং থাকবে। সবার মঙ্গল হোক।
লেখক : চেয়ারম্যান, বসুন্ধরা গ্রুপ








































আপনার মতামত লিখুন :