Daily Poribar
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

আমাদের নিজস্ব অন্ধকার ও এক অদ্ভুত হিমশীতল নিঃসঙ্গতা


দৈনিক পরিবার | সোহেইল মুশফিক জুন ৫, ২০২৬, ০২:১৮ পিএম আমাদের নিজস্ব অন্ধকার ও এক অদ্ভুত হিমশীতল নিঃসঙ্গতা

সম্প্রতি মিরপুরে এক মায়ের মৃত্যুর পর ফ্ল্যাটে লাশ পচে যাওয়ার ঘটনাটি নিয়ে ‘সমাজ-দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি’ থেকে আমার লেখা স্ট্যাটাসটিকে বন্ধু ও কবি কাজী দীন মুহম্মদ ‘তাত্ত্বিক বাগাড়ম্বর’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, নিজেকে সে আসলে ওই মায়ের মতো অবস্থানেই দেখতে পায়। তার নিজের বাবা-মায়ের প্রতি তার নিজের অতীত আচরণও মিরপুর ঘটনার মতোই প্রায় অভিন্ন ছিল এবং এসব ঘটনা আসলে ‘সভ্যতার উপঢৌকন’ বলেই তার দাবি।
কাজী দীন মুহম্মদ আরও বলেছেন—যেকোনো ট্র্যাজেডি ঘটলেই আমরা যেভাবে হুজুগে মেতে চটজলদি তাত্ত্বিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানে ঝাঁপিয়ে পড়ি, তা আসলে এক ধরণের পলায়নপর মানসিকতা। আমরা এটাকে ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘অমানুষিক’ বলে চিৎকার করি, কারণ আমরা নিজেদের ভেতরের সেই একই রূপটাকে স্বীকার করতে ভয় পাই।
আমার স্ট্যাটাসটি ছিলো উপরিতলের বয়ান কিন্তু কবি তাকালেন আরো ভেতরের দিকে। সংকটের মর্মমূলে হাত দিলেন কবি। যেখানে যেতে আমি ভয় পাই, সেদিকেই সে ঠেলে দিলো আমাকে। কবি কাজী দীন মুহম্মদের এই মন্তব্য আমাদের যৌথ ভণ্ডামির মুখোশটাকে এক ঝটকায় টেনে ছিঁড়ে ফেললো। বাঁচার পথ নেই আমাদের কারোই।
আসলে কে আমরা? কারা এই সামগ্রিক আমরা?
মানুষের ইতিহাসের নিষ্ঠুর সত্য হলো—একই সাথে আমরা মিরপুরের ফ্ল্যাটে মরে পঁচে থাকা সেই মা, একই সাথে আমরা সরকারের যুগ্ম সচিব, বুয়েটের শিক্ষক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের মতো সর্বোচ্চ সামাজিক ও মেধাভিত্তিক স্তরে থাকা সেই আত্মকেন্দ্রিক সন্তান। আবার একই সাথে আমরা সেই সন্তানও—যার সামাজিক স্ট্যাটাস নেই, প্রথাগত উচ্চশিক্ষা নেই, কিন্তু সম্পত্তির লোভে বা সামান্য কারণে পিতা-মাতাকে খুন করি কিংবা দুমুঠো ভাত দিতে অস্বীকৃতি জানাই। এবং দিনশেষে, একই সাথে আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার সেইসব বাইনারি সমালোচক—যারা নিজেদের ঈশ্বরের মতো পবিত্র জ্ঞান করি; খুব সহজেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিই মিরপুরের সন্তানদের, তাদের অমানুষ বলি, তাদের ফাঁসি চাই।
আমাদের এই বহুরূপী অস্তিত্বের খতিয়ানটা চলুন এবার একটু ঠান্ডা মাথায় ব্যবচ্ছেদ করে দেখি।
আমরা যখন সোশ্যাল মিডিয়ার বাইনারি সমালোচক হিসেবে অপরকে ‘অমানুষ’ দাগিয়ে দিই, তখন আসলে আমরা নিজেদের ভেতরের আসল নিষ্ঠুরতা বা ব্যর্থতা ঢাকা দেওয়ার একটা চাদর বুনি। আমরা ভাবি, অন্যের দিকে আঙুল তুললেই বুঝি আমাদের নিজেদের ভেতরের পশুত্বটা ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল। কিন্তু যখনই আমরা নিজেদের যাপিত জীবনের দিকে তাকাই, তখনই আমাদের মুখোশটা খসে পড়ে।
তখন আমরা দেখতে পাই, আমরা আসলে ওই উচ্চশিক্ষিত আমলা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের মতোই এক একজন সফল, অনুভূতিহীন ‘রোবট’। কাজী দীন মুহম্মদ যে তীব্র সততায় নিজের অতীত আচরণকে মিরপুরের ঘটনার সমান্তরালে এনেছেন (যা আসলে তার জীবনে ঘটেনি, সকল কমন পিওপলের প্রবণতার ধরণটা সে আসলে নিজের উপর দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছে), তা আসলে আমাদের সবারই গোপন আড়াল। আমরা এমন এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও উপযোগবাদী সমাজ বানিয়েছি, যেখানে প্রত্যেকে নিজের ক্যারিয়ার, নিজের আইডেন্টিটি আর নিজের স্বস্তির স্পেস নিয়ে এতটাই অন্ধ যে, জন্মদাতার নীরব দীর্ঘশ্বাস শোনার মতো সংবেদনশীলতা আমাদের অবশিষ্ট নেই। শহরের এসি রুমে বসে ক্যারিয়ারের লোভে মাকে ভুলে যাওয়া, আর গ্রামে সম্পত্তির  লোভে পিতাকে খুন করা—দুটোর প্রকাশ ভিন্ন হলেও মূলে কিন্তু এক; আর তা হলো মানুষের তীব্র আদিম ‘অহং’ (ঊমড়) ও সীমাহীন স্বার্থপরতা।
আর এই স্বার্থপরতার শেষ পরিণতিতেই, সবচেয়ে নির্মম সত্য হিসেবে আমরা আবিষ্কার করি—ভবিষ্যতের কোনো এক সময়ে আমরা প্রত্যেকেই আসলে মিরপুরের ফ্ল্যাটে একা পড়ে থাকা সেই মৃত মা। আমরা আমাদের সন্তানদের যে সফলতার অন্ধ ইঁদুরদৌড় আর বস্তুবাদের সহজ পাঠ শেখাচ্ছি, তার শেষ সমীকরণে আমরা নিজেরাই এক একজন ‘পরিত্যক্ত বস্তু’তে পরিণত হবো। যে সন্তানকে আমরা কেবল ‘নেওয়া’ আর ‘জেতা’ শেখালাম, সে সম্পর্কের মায়াতেও যে একদিন লাভ-ক্ষতির হিসাব মেলাবে—এটাই তো স্বাভাবিক।
আমার গত লিখাটির প্রতিপক্ষে কাজী দীন মুহম্মদের করা মন্তব্যটি তাই আমাদের এক অলঙ্ঘ্য দেয়ালের মুখোমুখি দাঁড় করায়। মানুষ কোনো সরল রেখা নয় যে তাকে এক লাইনে ‘ভালো’ বা ‘মন্দ’ বলে দেওয়া যাবে। মানুষের মনস্তত্ত্ব ভীষণ ধূসর। যে মানুষটি বাইরে একটা বিড়ালের বা দূর দেশের মানুষের কষ্টে আন্দোলিত হয়ে কেঁদে বুক ভাসায়, সে-ই আবার নিজের ঘরের ভেতরের মানুষের প্রতি চরম উদাসীন হতে পারে। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, ধর্ম বা সামাজিক অনুশাসন কোনো বাঁধ দিয়ে আমাদের আটকে রাখতে পারছে না। কারণ, এগুলো মানুষের বাহ্যিক আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করলেও ভেতরের আদিম অহংকারকে স্পর্শ করতে পারছে না।
আর মানুষের এই তীব্র আদিম ‘অহং’ ও সীমাহীন স্বার্থপরতার স্বরূপ সত্যিকার অর্থেই নিদারুণ নির্মম।
বাইরের কোনো প্রকৃতি, হিংস্র জন্তু বা ভৌগোলিক বিপর্যয় মানুষকে ‘মানুষ’ হতে বাধা দেয় না। মানুষ জন্মগতভাবে একটি জৈবিক সত্তা হিসেবে পৃথিবীতে আসে, কিন্তু সমাজ ও সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে তাকে একটি মানবিক সত্তা হিসেবে ‘হয়ে উঠতে’ হয়। আর এই হয়ে ওঠার দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ায় প্রতিটি পদে পদে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে অন্য কোনো মানুষ, অথবা স্বয়ং মানুষের নিজের ভেতরের ‘অহং’। 
মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধাই যে মানুষ—এই আপাতবিরোধী বা প্যারাডক্সিকাল কথাটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় এবং নির্মম মনস্তাত্ত্বিক সত্য। 
একটি শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, সে এক বুক নিষ্কলুষ মায়া আর সংবেদনশীলতা নিয়ে আসে। কিন্তু তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে থাকা ‘মানুষেরা’ই (পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র) তার সেই মানবিক সত্তাকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। মানুষের তৈরি করা এই পুঁজিবাদী ও প্রতিযোগিতামূলক সমাজ ব্যবস্থা শিশুকে শেখায় কেবল ‘জয়ী’ হওয়ার মন্ত্র। অন্য মানুষকে ছাড়িয়ে ওপরে ওঠাই যেখানে একমাত্র লক্ষ্য, সেখানে সহমর্মিতা, ত্যাগ বা ভালোবাসার মতো মানবিক গুণগুলো হারিয়ে যায়। সমাজ নামক মানুষের তৈরি এই যাতাকল একটি শিশুকে ‘মানুষ’ হতে না দিয়ে ক্যারিয়ারিস্ট ‘রোবট’ বা ‘খাঁচাবদ্ধ তোতাপাখি’ বানিয়ে ছাড়ে। অর্থাৎ, মানুষের মানবিকতা বিকাশের পথটি অন্য মানুষেরাই সুকৌশলে বন্ধ করে দেয়। 
মানুষের ভেতরের আদিম প্রবৃত্তি বা ‘অহং’ সবসময় তাকে আত্মকেন্দ্রিক হতে প্ররোচিত করে। যখন একজন মানুষ তার নিজের স্বার্থ, নিজের আরাম, এবং নিজের অহংকারকে বাকি পৃথিবীর চেয়ে বড় করে দেখে, তখন সে অন্য মানুষের দুঃখ-কষ্টের প্রতি অন্ধ হয়ে যায়। এই যে নিজের ভেতরের অন্ধকার সত্তা, যা মানুষকে নিষ্ঠুর বা উদাসীন হতে বাধ্য করে—সেটাও তো মানুষেরই অংশ। ফলে, নিজের ভেতরের ‘পশুত্ব’কে জয় করে ‘মানুষ’ হয়ে ওঠার লড়াইয়ে মানুষের নিজের ভেতরের ‘অহং’-ই তার সবচেয়ে বড় শত্রু। 
প্রকৃতি মানুষকে কেবল ‘মানুষ’ হিসেবেই সৃষ্টি করেছে। কিন্তু মানুষ নিজেই তার বুদ্ধি ও চাতুর্য দিয়ে তৈরি করেছে ধর্ম, বর্ণ, জাত, জাতীয়তাবাদ এবং শ্রেণির মতো হাজারো কৃত্রিম দেওয়াল। এই মানুষেরাই অন্য মানুষকে শেখায়—”ও তোমার ধর্মের নয়, ও তোমার জাতের নয়, ও তোমার দেশের নয়, সুতরাং ওকে ঘৃণা করো।” যে মানুষটির বিশ্বজনীন মায়া নিয়ে বড় হওয়ার কথা ছিল, অন্য মানুষেরা তাকে সংকীর্ণতার বিষবাষ্প খাইয়ে এক একজন উগ্র ও পরমতঅসহিষ্ণু জীবে পরিণত করে। মানুষের মানবিক হওয়ার পথে এই যে কৃত্রিম বিভেদের প্রাচীর, তা তো কোনো ঈশ্বর বা প্রকৃতি বানায়নি; বানিয়েছে মানুষই। 
মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার একটি অন্যতম শর্ত হলো অন্য মানুষকে মর্যাদার চোখে দেখা, তার অস্তিত্বকে সম্মান করা। কিন্তু আধুনিক মানুষ অন্য মানুষকে দেখে কেবলই ‘উপযোগিতা’ বা লাভের গুটি হিসেবে। কর্পোরেট বস তার কর্মচারীকে মানুষ ভাবেন না, ভাবেন উৎপাদনের যন্ত্র। সন্তান তার বৃদ্ধ মা-বাবাকে রক্ত-মাংসের মানুষ ভাবে না, ভাবে একটি অকেজো সামাজিক দায়িত্ব। মানুষ যখন অন্য মানুষকে নিজের স্বার্থের ‘বস্তু’ বা ‘টুলস’ হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন সে নিজেই আসলে মানবিক স্তর থেকে নিচে নেমে যায়। এই নিষ্ঠুরতার চক্রটি মানুষই সচল রাখে। 
মানুষের মেধা এবং জ্ঞান যেখানে তাকে আরও বিনয়ী এবং সংবেদনশীল করার কথা ছিল, অনেক সময় মানুষ সেই জ্ঞানকে ব্যবহার করে আরও চতুর, ধূর্ত এবং আত্মকেন্দ্রিক হতে। প্রথাবদ্ধ ও চতুর মানুষ সামাজিক অনুশাসন, আইন বা ধর্মের বাহ্যিক লেবাসকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করে নিজের ভেতরের পচনকে লুকিয়ে রাখে। এই চতুর মানুষেরা বাইরে মানবতার বুলি আউড়ায়, কিন্তু ভেতরে চরম নিষ্ঠুর আচরণ করে। মেধার এই ঋণাত্মক ব্যবহার মানুষকে মানুষ হতে দেয় না, বরং তাকে এক একজন কুশলী শোষক বানিয়ে তোলে। 
বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু উদ্ভিদের ক্লান্তি ও সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু মানুষের তৈরি এই যান্ত্রিক সভ্যতায় মানুষের হৃদয়টাই আজ সবচেয়ে বেশি জড় পদার্থে পরিণত হয়েছে। মানুষই মানুষের ডানা কেটে দেয়, আবার মানুষই মানুষকে খাঁচায় বন্দি করে হাততালি দেয়। 
এ সবই কাজী দীন মুহম্মদের বলা “সভ্যতার উপঢৌকন” আমাদের জন্য।
আমাদের তাই পস্তাতেই হবে, নানান ঘটনায়, নানান ঘটনাপ্রবাহে।
এই পস্তানি আসলে কোনো সাময়িক অনুশোচনা নয়; এটি আমাদের সেই নিয়তি, যাকে আমরা নিজেরাই পরম যত্নে লালন করছি। আমরা যাকে প্রগতি বলছি, তা আসলে এক ধরণের সুসজ্জিত অন্ধত্ব। একদিন হয়তো আমরা পৃথিবীর সব রহস্যের পাঠোদ্ধার করে ফেলবো, কিন্তু নিজেদের ভেতরের এই আদিম অন্ধকারের কাছে বারবার হেরে যাব। মিরপুরের সেই নিথর ফ্ল্যাটটি কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ছিল না, ওটি আসলে আমাদের এই আধুনিক কোলাহলের বুক চিরে জেগে থাকা এক নীরব কঙ্কাল।
আজ আমি এই লেখার টেবিলে বসে যে সত্যটাকে ব্যবচ্ছেদ করছি, কাল হয়তো জীবনের চতুরতায় আমিও এর অংশ হয়ে যাব। কোনো মহৎ গ্রন্থ, কোনো আধুনিক দর্শন বা কোনো তীব্র অনুশোচনাও আমাদের এই সামষ্টিক পচন থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। চাকা ঘুরছে, আর আমরা প্রত্যেকেই পালাক্রমে কখনো শোষক, কখনো সমালোচক, আর দিনশেষে অবধারিতভাবে এক একজন পরিত্যক্ত শিকার হয়ে উঠছি।
সভ্যতার এই গোলকধাঁধায় দাঁড়িয়ে আমরা শুধু এটুকুই করতে পারি—নিজেদের যৌথ ভণ্ডামির দিকে তাকিয়ে একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলতে পারি। কারণ, যে খাঁচা আমরা নিজেরা মিলে বুনেছি, সেখান থেকে ডানা ভাঙা পাখিটার উড়ে যাওয়ার আর কোনো পথ খোলা নেই। আমরা শুধু অপেক্ষা করতে পারি আমাদের নিজস্ব অন্ধকারের, আর এক অদ্ভুত হিমশীতল নিঃসঙ্গতার।

Side banner