Daily Poribar
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বাংলার জমিদারি প্রথা: উত্থান, শোষণ ও পতন


দৈনিক পরিবার | আব্দুর রহিম  মে ১৬, ২০২৬, ১১:২৭ এএম বাংলার জমিদারি প্রথা: উত্থান, শোষণ ও পতন

বাংলার ইতিহাসে জমিদার প্রথা একদিকে যেমন ক্ষমতা ও প্রভাবের প্রতীক ছিল, অন্যদিকে এটি সাধারণ কৃষকের জীবনে বয়ে এনেছিল দীর্ঘ শোষণ, দারিদ্র্য ও বঞ্চনার ইতিহাস। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাংলার গ্রামীণ সমাজে জমিদারদের কর্তৃত্ব ছিল প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। খাজনার চাপ, লাঠিয়াল বাহিনীর অত্যাচার এবং ভূমির ওপর কৃষকের অধিকারহীনতা বাংলার কৃষক সমাজকে বারবার বিদ্রোহে ফেটে পড়তে বাধ্য করেছে।
জমিদার প্রথা মূলত এমন একটি ভূমি ব্যবস্থা, যেখানে সরকার নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবারকে কোনো অঞ্চলের জমি থেকে রাজস্ব আদায়ের অধিকার প্রদান করত। কৃষকরা জমিতে চাষাবাদ করলেও জমির নিয়ন্ত্রণ থাকত জমিদারদের হাতে। মুঘল আমলে এর সূচনা হলেও ব্রিটিশ শাসনামলে এই প্রথা আরও শক্তিশালী ও স্থায়ী রূপ লাভ করে।
১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল Lord Cornwallis “চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত” চালু করেন। এর মাধ্যমে জমিদারদের ভূমির স্থায়ী মালিকানার স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং তারা ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পায়। ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য ছিল নিয়মিত রাজস্ব নিশ্চিত করা এবং নিজেদের অনুগত একটি ধনী শ্রেণি তৈরি করা। কিন্তু এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ে সাধারণ কৃষকের জীবনে।
জমিদারদের অত্যাচারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতো দরিদ্র কৃষক, ভাগচাষি ও ক্ষেতমজুররা। সময়মতো খাজনা দিতে না পারলে কৃষকদের জমি কেড়ে নেওয়া হতো, অনেক ক্ষেত্রে তাদের বাড়িঘর পর্যন্ত নিলামে উঠত। লাঠিয়াল বাহিনীর মাধ্যমে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং জোরপূর্বক আদায় ছিল সে সময়ের সাধারণ ঘটনা। ফসল নষ্ট হলেও কৃষকদের খাজনা দিতে বাধ্য করা হতো।
জমিদার প্রথার বিরুদ্ধে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষক বিদ্রোহ ও আন্দোলন গড়ে ওঠে। ইতিহাসে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ছিল অন্যতম প্রথম বড় প্রতিরোধ। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন মজনু শাহ, মুসা শাহ এবং ভবানী পাঠক। তারা ব্রিটিশ শাসন ও জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করেন।
পরবর্তীতে ১৮৫৯-৬০ সালের নীল বিদ্রোহ জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে কৃষকদের তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হয়ে ওঠে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন দিগম্বর বিশ্বাস ও বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস। কৃষকদের মুখে মুখে তখন ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবাদের ভাষা।
“জান দেব, তবু নীল চাষ করব না।”
পাবনা কৃষক আন্দোলনেও জমিদারদের অন্যায় খাজনার বিরুদ্ধে কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়। এই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন ঈশান চন্দ্র রায়। পরে তেভাগা আন্দোলনে ভাগচাষিরা দাবি তোলে, উৎপাদিত ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ চাষির অধীনে রাখতে হবে। এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ইলা মিত্র এবং হাজী মোহাম্মদ দানেশ।
জমিদার প্রথার বিরুদ্ধে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন স্লোগান বাংলার কৃষক আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়। যেমন-
“লাঙল যার, জমি তার”
“খাজনা কমাও, কৃষক বাঁচাও”
“জমিদারি প্রথা নিপাত যাক”
“তেভাগা চাই, ন্যায্য ভাগ চাই”
বাংলার নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, রাজশাহী, পাবনা, দিনাজপুর, যশোর, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে জমিদার প্রথার প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। এসব অঞ্চলে কৃষকদের ওপর শোষণ ও খাজনার চাপ ছিল অত্যন্ত তীব্র।
তবে ইতিহাসবিদরা উল্লেখ করেন, কিছু জমিদার শিক্ষা ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতাও করেছেন। অনেক স্কুল, কলেজ, মন্দির, মসজিদ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান তাদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সামগ্রিকভাবে জমিদার প্রথা ছিল বৈষম্য ও শোষণনির্ভর একটি ব্যবস্থা।
দীর্ঘ কৃষক আন্দোলন, গণঅসন্তোষ ও ভূমি সংস্কারের দাবির মুখে শেষ পর্যন্ত জমিদারি প্রথার অবসান ঘটে।
বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ১৬ মে, ১৯৫০ সালে “East Bengal State Acquisition and Tenancy Act ” এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করা হয়। এর ফলে জমিদারদের বিশেষ অধিকার বাতিল হয় এবং কৃষকদের ভূমির ওপর অধিকতর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলার ইতিহাসে জমিদার প্রথা আজ অতীতের বিষয় হলেও এর স্মৃতি এখনো সাহিত্য, লোককাহিনি ও কৃষক সংগ্রামের ইতিহাসে জীবন্ত হয়ে আছে। এটি শুধু একটি ভূমি ব্যবস্থার ইতিহাস নয়; বরং শোষণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামেরও এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
আব্দুর রহিম 
পাবলিক পলিসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্র্যাকটিশনার

Side banner