ভাবুন তো, কোন এক সকালে ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করলেন, কেউ আপনার তথ্য চুরি করে আপনার নামে সিম কার্ড নিবন্ধন করেছে এবং সেগুলো দিয়ে অপরাধ ঘটিয়েছে, অথচ পুরো ঘটনাই ঘটেছে আপনার অজান্তে। পরবর্তীতে যখন আইন প্রয়োগকারী বা তদন্ত সংস্থা অপরাধীদের শনাক্ত করতে অনুসন্ধান শুরু করে, তখন ব্যবহৃত সিমের নিবন্ধন তথ্য অনুসরণ করতে গিয়ে তারা প্রকৃত অপরাধীর কাছে নয়, বরং পৌঁছে যায় আপনার দরজায়।
ভয়ঙ্কর শোনালেও এমন ঘটনা এখন বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। হরহামেশায় এ ধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
সম্প্রতি সাইবার প্রতারণার শিকার হন ফাল্গুনী নামের এক নারী। তার ভাইয়ের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার আগে এক ব্যক্তি ফোন করে দাবি করেন যে তিনি একটি পুরস্কার জিতেছেন। ফোনকারী তার ভাইয়ের ব্যক্তিগত তথ্য সম্পর্কে অবগত ছিলেন, ফলে বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। একপর্যায়ে ফাল্গুনী প্রতারকের কথায় বিশ্বাস করে ব্যাংক কার্ডের তথ্য ও ওটিপি শেয়ার করেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে তার অ্যাকাউন্ট থেকে ৬০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। অভিযোগ দায়ের করেও তিনি কোনো কার্যকর প্রতিকার পাননি। এর কারণ খুঁজতে গেলে সিম জালিয়াতির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে ২০২৫ সালের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে একজন জাতীয় পরিচয়পত্রধারী ব্যক্তির নামে সর্বোচ্চ ১৫টি সিম নিবন্ধনের সুযোগ ছিল। পরবর্তীতে এই সীমা কমিয়ে ১০টি নির্ধারণ করা হলেও বিশেজ্ঞদের মতে বর্তমান সীমাটিও পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ বাস্তবতায় অধিকাংশ ব্যক্তিগত গ্রাহকের ১০টি সীম ব্যবহারের কোনো যৌক্তিক প্রয়োজন দেখা যায় না; বরং সাধারণত একজন ব্যক্তি ১ থেকে ২টি সিম ব্যবহার করেই তার দৈনন্দিন যোগাযোগের চাহিদা পূরণ করেন। ফলে নিবন্ধনসীমার অব্যবহৃত অংশকে কাজে লাগিয়ে প্রতারক চক্র বিভিন্ন উপায়ে সাধারণ মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করে সিম নিবন্ধন করে থাকে। এসব সিম আনষ্ঠানিকভাবে সাধারণ নাগরিকের নামে নিবন্ধিত হলেও বাস্তবে সেগুলো বিভিন্ন সাইবার ও ডিজিটাল প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়। এর পরিণতিতে ভুক্তভোগী হন নিরীহ নাগরিকেরা, অথচ প্রকৃত অপরাধীরা আইন-প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি ও জবাবদিহিতার বাইরে থেকে যায়।
অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এই ধরনের সিম ভিত্তিক অবকাঠামো ব্যবহার করে সংঘটিত ছয় ধরনের অপরাধ আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করেছে; এমএফএস প্রতারণা, ই-কমার্স জালিয়াতি, চাঁদাবাজি, অপহরণ সমন্বয়, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রম। ফরিদপুরে একটি বিকাশ প্রতারণা চক্র ৩৮টি সিম কার্ড ব্যবহার করেছিল, যার প্রতিটিই ভিন্ন ভিন্ন নিরীহ ব্যক্তির এনআইডির নামে নিবন্ধিত ছিল। একইভাবে, ২০২৪ সালের জুন মাসে রাজধানী ঢাকায় পরিচালিত একটি বিটিআরসি অভিযানে একটি অবৈধ ভিওআইপি নেটওয়ার্ক থেকে ১৭ হাজার ৩৫৪টি সিম উদ্ধার করা হয়, যা সমস্যাটির ব্যাপকতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও এর প্রভাব অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ৪৫টি জেলার ৭,২০০ জন অংশগ্রহণকারীর ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, মোবাইল আর্থিক সেবার ব্যবহারকারীদের ৯.৩ শতাংশ কোনো না কোনো সময় প্রতারণার শিকার হয়েছেন এবং প্রতিটি ঘটনায় গড়ে প্রায় ৯,০০০ টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যারা এখনও মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করেন না, তাদের ৪৫ শতাংশের প্রধান কারণ প্রতারণার আশঙ্কা।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
বাংলাদেশে সকল ডিজিটাল প্রতারণার ৭৩% সংঘটিত হয় অবৈধ বা প্রতারণামূলকভাবে নিবন্ধিত সিম কার্ড ও ডিভাইস ব্যবহার করে।
এমএফএস ব্যবহারকারীদের ৯.৩%-প্রায় প্রতি ১০ জনে ১ জন প্রতারণার শিকার হয়েছেন, প্রতি ঘটনায় গড়ে ৯,০০০ টাকা হারিয়েছেন।
এমএফএস ব্যবহার না করা মানুষদের ৪৫% মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার না করার প্রধান কারণ হিসেবে প্রতারণার ভয়কে উল্লেখ করেছেন।
একটি বিকাশ প্রতারক চক্র একটিমাত্র প্রতারণায় ৩৮টি সিম কার্ড ব্যবহার করেছিল, যার প্রতিটিই ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির এনআইডি-র অধীন ছিল।
বর্তমানে বাংলাদেশের ১১ কোটি নিবন্ধিত এমএফএস অ্যাকাউন্ট দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের প্রতিফলন। কিন্ত সিম নির্ভর প্রতারণা এই সাফল্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের প্রতিবেশী ও সমপর্যায়ের অনেক দেশ ইতোমধ্যেই কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সিঙ্গাপুরে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির মাধ্যমে যাচাই সাপেক্ষে একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ ৩টি সিম কার্ডের মালিক হতে পারেন। দক্ষিণ কোরিয়াতেও একই সীমা কার্যকর রয়েছে। সৌদি আরবও নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধের স্বার্থে প্রবাসীদের জন্য সর্বোচ্চ দুটি সিম কার্ডের অনুমতি দেয়। এর বিপরীতে বাংলাদেশে এখনও একজন এনআইডিধারী সর্বোচ্চ ১০টি সিম নিবন্ধন করতে পারেন, যা আঞ্চলিক মানদণ্ডের তুলনায় অত্যন্ত পিছিয়ে।
প্রতি এনআইডির বিপরীতে সর্বোচ্চ এক বা দুটি সিমের কার্ডের সীমা নির্ধারণ এবং অন্যান্য দেশের ন্যায় কার্যকর যাচাই ও তদারকি ব্যবস্থা চালু করা হলে এই অপরাধচক্রের কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হবে। তবে সিমের সংখ্যা কমিয়ে আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি একমাত্র সমাধান নয়; নাগরিকদের ব্যক্তিত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমানভাবে জরুরি।
এই অসাধু চক্রের কার্যক্রম কেবল প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়; নিবন্ধিত সিমের অপব্যবহারের মাধ্যমে তারা অবৈধ ভিওআইপি কল পরিচালনা, অনলাইন জুয়া এবং অন্যান্য সমাজবিধ্বংসী ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডেও জড়িত থাকে। ফলে সিম নিবন্ধনের সর্বোচ্চ সীমা পুনর্মূল্যায়ন এবং প্রকৃত ব্যবহারকারীকেন্দ্রীক একটি যৌক্তিক সীমা নির্ধারণ করা সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক উদাহরণও পরীক্ষিত ও সফল। এখন প্রয়োজন কেবল কার্যকর রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দ্রুত নীতিগত পদক্ষেপ।








































আপনার মতামত লিখুন :