Daily Poribar
Bongosoft Ltd.
ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল, ২০২৬, ২৪ চৈত্র ১৪৩২

শুভ জন্মদিন নজরুল ইসলাম বাবু


দৈনিক পরিবার | দেলওয়ার এলাহী জুলাই ১৮, ২০২২, ০১:০৩ পিএম শুভ জন্মদিন নজরুল ইসলাম বাবু

হৃদয়ের চেয়ে ভালো কোন ফুলদানি নেই : নজরুল ইসলাম বাবু
১৯৭৩ সালে শাহবাগ রেডিও স্টেশনের ক্যান্টিনে চা-নাস্তা খেতে এসেছেন সুরকার শেখ সাদী খান। সহসা এক তরুণ তাঁর কাছে এসে বললেন-
: 'আপনার সঙ্গে কিছু কথা ছিল।'
: 'কি ব্যাপারে?'
: আমার নাম নজরুল ইসলাম বাবু। আমি কবিতা লিখি। গান লিখি। আপনি যদি আমার লেখা একটু দেখতেন!
: ঠিক আছে। আসুন, বসে কথা বলা যাক। আপনি তো বয়সে আমার ছোট হবেন। কিছু মনে না করলে আপনাকে কি আমি 'তুমি' বলে সম্বোধন করতে পারি?
: নিশ্চয়ই। আমাকে তুমিই বলবেন।
: এখন কি কোন লেখা আছে সাথে?
আছে। এই বলে শেখ সাদী খানের হাতে পকেট থেকে একটা গানের কবিতা বের করে দিলেন নজরুল ইসলাম বাবু। লেখাটার প্রথম দুই পঙক্তি এরকম-
আমি বললাম আলো
অমনি আমার হাজার দুয়ার বন্ধ হয়ে গেল...
লেখাটা পড়ে শেখ সাদী খানের পছন্দ হলো। তাঁর মনে হলো বাবুর মধ্যে কবি কল্পনার শক্তি আছে। তিনি একটি কাগজে ঠিকানা লিখে নজরুল ইসলাম বাবুর হাতে দিয়ে বললেন- তিনদিন পরে বাসায় এসো। এবং আমাদের সৌভাগ্য সেই থেকে শুরু হয়ে গেলো বাংলা গানের ইতিহাসে শেখ সাদী খান ও নজরুল ইসলাম বাবুর অনবদ্য জুটি। অসাধারণ কিছু গান তাঁরা দু'জনে সৃষ্টি করেছেন! সাথে গান লেখা মুহূর্ত নিয়ে মজার মজার গল্পও। দু'একটা এখানে উল্লেখ করি। রাতের বেলা ফুটপাতে চায়ের দোকানের সামনে লেম্বপোস্টের আলোয় দাঁড়িয়ে নজরুল ইসলাম বাবু ও শেখ সাদী খান গল্প করছেন। সহসা নজরুল ইসলাম বাবু বলে উঠলেন -
পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই! পরে এটাকেই গান বানালেন দু'জন মিলে-
হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে / একটি কথাই শুধু জেনেছি আমি / পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই /
প্রেম বলে কিছু নেই... সুবীর নন্দীর কণ্ঠে রেকর্ড করা এই গানটি এখন সবার মুখে মুখে।
বেনজির আহমেদের পরিচালনায় 'প্রতিরোধ' নামে একটি ছবি হবে৷ সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে আছেন শেখ সাদী খান। সুরকার শেখ সাদী খানকে ডেকে পরিচালক ছবির গল্প বললেন। সঙ্গে আছেন নজরুল ইসলাম বাবুও। সেই মোতাবেক গান বানাতে অনুরোধ করলেন৷ পরিচালকের বাসা থেকে শেখ সাদী খান ও নজরুল ইসলাম বাবু রিক্সা নিয়ে ফিরছেন। শেখ সাদী খান বাবুকে বললেন - কী করা যায়? গান কীভাবে তৈরি করা যায়, চিন্তা করে লিখতে লেগে যাও। বাবু সিগারেটে টান দিয়ে শূন্যে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন -
ডাকে পাখি, খোল আঁখি /
দ্যাখো সোনালি আকাশ /
বহে ভোরের বাতাস...। শেখ সাদী খান শোনে বললেন- বাহ। এটাতো সহজ সুন্দর ছড়ার মতো। ভালোই লাগছে। এটাকেই গান বানাবো। তিনি গানের মুখটা রিক্সাতেই সুর করলেন। পরে ঘরে এসে অন্তরা লেখা হলো এবং সুরও সম্পন্ন হলো।
প্রতিরোধ ছবির প্রথম গানটি এভাবেই লেখা হলো। এই গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন হৈমন্তী শুক্লা৷ গানটি রেকর্ড করতে গীতিকার ও সুরকার কলকাতায় গেলে শিল্পী হৈমন্তী শুক্লার সঙ্গে সুরকার শেখ সাদী খানের সংযোগ ঘটিয়ে দেন তাঁর বড় ভাই ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খান। এই গানটি রেকর্ডের সময় স্টুডিওতে এসে উপস্থিত হোন বাংলা গানের অসামান্য গীতিকার গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার। রেকর্ড হওয়ার পরে গীতিকার ও সুরকারকে ডেকে গানটির ভূয়সী প্রশংসা করেন মজুমদার বাবু।
সুরকার শাহনেওয়াজ ও নজরুল ইসলাম বাবু রিক্সা করে যাচ্ছিলেন। ট্রেন আসবে বলে রেল গেইট বন্ধ। বাবুর আঙ্গুলের ফাঁকে সিগারেট জ্বলছিল। দুটো টান দিয়ে প্রায় আস্ত সিগারেটটি ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। পকেট থেকে বের করে সিগারেট প্যাকেটের সবকটি সিরাগেটও ফেলে দিলেন। সেই সিগারেট প্যাকেটের  সাদা পৃষ্ঠায় রিক্সায় বসেই লিখলেন -
দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা, বন্ধু চিরকাল /
রেললাইন বহে সমান্তরাল...। দিলরুবা খানের কণ্ঠে এই গানটি রেকর্ড করা হয়। এবং খুবই জনপ্রিয় হয় গানটি।
'কাল সারারাত ছিল স্বপনের রাত
স্মৃতির আকাশে যেন বহুদিন পর
মেঘ ভেঙে উঠেছিল পূর্ণিমা চাঁদ...
নজরুল ইসলাম বাবুর লেখা গানটি শেখ সাদী খান শিল্পী রেহানা আশিকুর রহমানের ক্যাসেটের জন্য শিল্পীর বাসায় বসেই সুর করেন। পরে প্রযোজকের অনুরোধে চলচ্চিত্রের জন্য গানটি রেকর্ড করেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী আশা ভোঁসলে। তারও পরে বেবী নাজনীন গানটি রেকর্ড করে বিশাল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবু ১৯৪৯ সালের ১৭ জুলাই জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলায় চরনগর গ্রামে মাতুতালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক গ্রামের নাম হেমাড়াবাড়ি। পিতা বজলুল কাদের ও মাতা রেজিয়া বেগম। সঙ্গীত অনুরাগী পিতার উৎসাহেই নজরুল ইসলাম বাবু কবিতা ও গান লেখায় উৎসাহী হোন। উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানের সময় জামালপুর আশেক কলেজের তুখোড় ছাত্রনেতা ছিলেন নজরুল ইসলাম বাবু। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে সামনের কাতারে ছিলেন তিনি। সত্তরের নির্বাচনের সময় পাকিস্তানি শাসক শ্রেণি গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করলো তাঁর উপর। গ্রেফতার এড়িয়ে তিনি ভারতে গেলেন৷ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ১১ নং সেক্টরে তুরার পাহাড়ে বসে যুদ্ধ প্রশিক্ষণের অবসর মুহূর্তে গান লিখতেন নজরুল ইসলাম বাবু। ট্রেনিং শেষ করে দেশে এসে পুরোদমে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তাঁর কাজ হলো হানাদার বাহিনীর যাতায়াত রুদ্ধ করতে ব্রিজ-কালভার্ট উড়িয়ে দেওয়া।
সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন বলেই নজরুল ইসলাম বাবু অনবদ্য সব দেশাত্মবোধের গান লিখেছিলেন। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুরে এবং সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে সেই অনবদ্য গানটির কথা স্মরণ করুন -
উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম
সব ঘুরে এক ব্রহ্মচারী
চমকে তাকালো, থমকে দাঁড়ালো
দেখলো, দূরে একটা ছোট্ট গ্রাম দেখা যায়
গ্রামটা, ছুঁয়ে একটা নদী বহে যায়
ধীরে ধীরে ধীরে ধীরে...
অথবা, একই সুরকার ও শিল্পীর কণ্ঠে -
'ও আমার আট কোটি ফুল
দেখো গো মালি
শক্ত হাতে বাইন্দো মালি
লোহারো জালি!'
অথবা সুরকার আলাউদ্দীন আলীর সুরে ও রুনা লায়লার কণ্ঠে সেই গানটি-
'আমায় গেঁথে দাওনা মাগো
একটা পলাশ ফুলের মালা।
আমি জনম জনম রাখবো ধরে
ভাই হারানোর জ্বালা!
আমায় গেঁথে দাওনা মাগো
একটা পলাশ ফুলের মালা!'
অথবা,
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুরে সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে সেই অনবদ্য অনন্য গানটি-
'সবকটা জানালা খুলে দাওনা
আমি গাইবো গাইবো বিজয়েরই গান
ওরা আসবে চুপি চুপি
যারা এই দেশটাকে ভালোবেসে
দিয়ে গেছে প্রাণ
সবকটা জানালা খুলে দাওনা!'
দেশের প্রতি কত গভীর ভালোবাসা থাকলে এরকম গান লেখা সম্ভব!
নজরুল ইসলাম বাবু তাঁর লেখা গানের কবিতায় সুরের প্রয়োজনে বা মিটারের প্রয়োজনে কোন শব্দ পরিবর্তন করতে পছন্দ করতেন না। যেভাবে লেখাটা তাঁর কলমে এসেছে তিনি এর হেরফের চাইতেন না। উপরের এই গানটিতে নজরুল ইসলাম বাবুর মূল লেখায় ছিল- 'সবকটা দরজা খুলে দাওনা।' সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল সুরের বা শ্রুতির দাবীতেই হোক 'দরজা'র স্থলে 'জানালা' লাগিয়ে দিয়েছিলেন বলে বাবু বুলবুলের সঙ্গে প্রায় সম্পর্কচ্ছেদ করেছিলেন।
এছাড়াও নজরুল ইসলাম বাবু অসংখ্য হৃদয়সংবেদী প্রেমের গান লিখেছিলেন। যেমন :
সুরকার আলী হোসেনের সুরে -
'কত যে তোমাকে ভেসেছি ভালো
সে কথা তুমি যদি জানতে
এই হৃদয় ছিঁড়ে যদি দেখানো যেত
আমি যে তোমার তুমি মানতে'
শেখ সাদী খানের সুরে -
'আমি বৃষ্টিতে ভেজা রজনীগন্ধা নাকি
নয়তো সে দেখলো কি
আমার লজ্জা ছুঁয়ে
ছড়িয়ে জলের উঁকি...'
সেলিম আশরাফের সুরে শিল্পী নিয়াজ মোহাম্মাদ চৌধুরীর কণ্ঠে-
'প্রেম যেন এক প্রজাপতি
চোখে এসে বসে
স্মৃতি হয়ে থাকে তোলা
মনেরই আরশে।'
নজরুল ইসলাম বাবু বাংলাদেশের একজন ক্ষণজন্মা গীতিকবি। তাঁর লেখা গান বাংলাদেশের গানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশে দেশাত্মবোধের চেতনায় এদেশের গীতিকবিরা অনন্যসাধারণ সব গান লিখেছেন। আব্দুল লতিফ, ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ড. আবু হেনা মোস্তাফা কামাল, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান, নয়ীম গহর প্রমুখের দেশাত্মবোধের অনবদ্য গানের কবিতার তালিকায় নজরুল ইসলাম বাবুর সংযোজন বাংলাদেশের সংস্কৃতির চিরকালের সম্পদ।
নজরুল ইসলাম বাবু ১৯৮৬ সালে শাহীন আক্তারের সঙ্গে সংসার জীবন শুরু করেন। তাঁদের দুটি সন্তান : নাজিয়া ইসলাম, নাফিয়া ইসলাম। সংসার জীবন শুরু করার চার বছর পর ১৯৯০ সালে সেপ্টেম্বর মাসে মাত্র ৪১ বছর বয়সে বাবু পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। চিরকালের জন্য চলে যাওয়ার আগে তিনি আমাদের জন্য রেখে গিয়েছেন, ব্যক্তি প্রেমের কিংবা দেশপ্রেমের অনবদ্য আর্তিমাখা গান। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে, একজন গীতিকার হিসেবে তিনি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন। অথচ, রাষ্ট্র আজ পর্যন্ত তাঁকে কোন সম্মান দিলেন না! যেমন রাষ্ট্র সম্মান দিলেন না বর্তমানে ক্যান্সার আক্রান্ত বাংলা গানের অনন্যসাধারণ সুরকার আলাউদ্দীন আলীকেও। এই অপরিণামদর্শীতা, এই অবিবেচনা, এই অপরিপক্কতা যেমন লজ্জার; তেমনি অনেকাংশে অপরাধও। কেননা, রাষ্ট্রের পদক পাওয়ার প্রকৃত দাবীদার বা গুণীদেরকে পদক থেকে কৌশলে বঞ্চিত করা বা দেরী করে প্রদান করার অপরিণামদর্শীতাকে অপরাধই মনে করি আমি।
সুরকার আলী হোসেন, সুরকার আলাউদ্দীন আলী, গীতিকার মাসুদ করিম, গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবু প্রমুখকে রাষ্ট্রীয় পদক দিয়ে সম্মানিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে আবেদন করছি। বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে এই আবেদন করার অধিকার আমার আছে।
গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবুসহ বাংলা গানের অপরাপর গীতিকারদের অবিস্মরণীয় সৃষ্টি সম্ভারের প্রতি আমার অবিরাম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
অভিবাদন নজরুল ইসলাম বাবু। শুভ জন্মদিন।
দেলওয়ার এলাহী
টরন্টো, কানাডা।

 

Side banner