Daily Poribar
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪, ৭ বৈশাখ ১৪৩১
নৌকার প্রার্থী ঘোষনার পর

বরিশালের রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন


দৈনিক পরিবার | বরিশাল প্রতিনিধি এপ্রিল ১৮, ২০২৩, ০২:০০ এএম বরিশালের রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন

আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর ক্রমেই বরিশালের রাজনৈতিক মাঠে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। দীর্ঘদিন চুপ করে থাকা নগরবাসী গত দুইদিন ধরে মনোনয়ন বঞ্ছিত বর্তমান মেয়রের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন।
বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে নগরবাসীর মধ্যে আলোচনা ছিলো কে পাচ্ছেন আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন। সরাসরি এনিয়ে এতোদিন কেউ কোনো ধরনের মন্তব্য করতে সাহস পায়নি। তবে গত ১৫ এপ্রিল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়া পর থেকে গত দুইদিন বরিশালে আনন্দ মিছিল বের করেছে বতর্মান মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ বিরোধী নেতাকর্মীরা। বর্তমান মেয়র দ্বিতীয় মেয়াদে মনোনয়ন না পাওয়ায় গত দুইদিন বেশ কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ইফতার বিতরণও করা হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের করের বোঝা চাঁপিয়ে দেওয়া সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে দেখা গেছে স্বস্তির ছাপ। নগরীর অধিকাংশ বাড়িওয়ালার চোখে মুখে দেখা গেছে আনন্দের অনুভূতি।
সাবেক সিটি মেয়র ও সাবেক সংসদ সদস্য বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, বর্তমান মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ আমার কাছে পরামর্শ চাইতে এসেছিলো। আমি ওকে বারবার বলেছিলাম, তুমি ছোট ছোট প্রকল্প গ্রহণ করে নগরীর উন্নয়ন ঘটাও। কিন্তু মেয়র তা না করে সে একসাথে মেঘা প্রকল্প করতে চেয়েছে। সরোয়ার আরও বলেন, জনবিচ্ছিন্ন হয়ে কি জনতার সেবক হওয়া যায়।
মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মেয়র নির্বাচিত হয়েই বিসিসির অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাকরিচ্যুত করা উচিত হয়নি। তিনি (মেয়র) কারও কথা শুনতেন না, তিনি যা নিজে ভাল মনে করতেন তাহাই করতেন। তাই তাকে কেউ কোন কাজে বাঁধা দেওয়ার সাহস পায়নি। এসব কিছুই প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বিচার বিশ্লেষণ করে মনোনয়ন দিয়েছেন তারই একমাত্র চাচা আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ ওরফে খোকন সেরনিয়াবাতকে।
খোকন সেরনিয়াবাত বরিশালের রাজনীতিতে নতুন হলেও সেরনিয়াবাত পরিবারের সন্তান হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার পর ইতোমধ্যে তিনি নগরীতে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেন। নগর চিন্তাবিদ কাজী মিজানুর রহমান বলেন, সার্বিক বিবেচনা ও নগরীর উন্নয়নের জন্য আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী যেই হোক ভোটারদের তাকেই মূল্যায়ন করা উচিত হবে। কেননা গত পাঁচ বছর বরাদ্দ পায়নি বিসিসি। সেটা পুষিয়ে নিতে হলে আগামী ১২ জুনের নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর বিকল্প নেই।
বীর প্রতীক মহিউদ্দিন মানিক বলেন, আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী খোকন সেরনিয়াবাত একজন পরিচ্ছন্ন ব্যক্তি। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভয়াল কাল রাতে গুলিবিদ্ধ হয়েও প্রাণে বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শী। সচেতন নগরবাসীদের দাবি, বরিশালের উন্নয়নের জন্য মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর অনেক সুযোগ ছিলো। কিন্তু গত পাঁচ বছরে তিনি তেমন কিছুই করতে পারেননি। উল্টো সবকিছুতেই সমালোচিত হয়েছেন।
জেলা বাসদের সদস্য সচিব ডাক্তার মনীষা চক্রবর্তী বলেন, নিজের খামখেয়ালী ছাড়া বর্তমান মেয়রের ঝুড়িতে আর কিছুই প্রাপ্তি নেই। ট্যাক্সের বোঝা ছাড়া তার কাছ থেকে নগরবাসী আর কিছুই পায়নি। তিনিই একমাত্র মেয়র যার সময় কোনো বরাদ্দ পায়নি বরিশাল সিটি কর্পোরেশন। উল্টো তিনি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
অপরদিকে সাদিক আব্দুল্লাহর সমর্থনে বেশকিছু নেতাকর্মীরা বলেন, নগরীর ৩০টি ওয়ার্ড সাদিক আব্দুল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। এসব ওয়ার্ডের নেতাকর্মীরা মনোনয়ন পাওয়া খোকন সেরনিয়াবাতের পক্ষে প্রকাশ্যে না নামলে তার জন্য দীর্ঘপথ পারি দেওয়া কষ্টকর হবে। তবে মনোনয়ন পাওয়ার পর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে নৌকার প্রার্থি আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ ওরফে খোকন সেরনিয়াবাত বলেন, গত পাঁচ বছর বরিশালে কোনো উন্নয়ন হয়নি। নগরবাসী আমাকে নির্বাচিত করলে তাদের প্রত্যাশা পূরণে শতভাগ স্বচ্ছ থেকে কাজ করবো এবং প্রধানমন্ত্রী যে বিশ্বাসে আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন সে বিশ্বাসের মর্যাদা রাখবো।
অপরদিকে বিসিসি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতীয় পার্টি থেকে একবছর আগেই মেয়র পদে লড়তে মনোনয়ন নিশ্চিত করে রাখা হয়েছে। দলটি থেকে নির্বাচনে লড়বেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের উপদেষ্টা প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন তাপস। মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই তিনি বরিশালের হতদরিদ্র মানুষের মাঝে কাজ শুরু করেছেন। এমনকি তিনি গড়ে তুলেছেন ‘ফরএভার লিভিং সোসাইটি’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ওই সংগঠনে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার সদস্য রয়েছে মহানগরীতে।
এ সম্পর্কে প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন তাপস বলেন, জনগণ যদি আমাকে নির্বাচিত করেন তাহলে সবার আগে আমি বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের মাধ্যমে সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে বাণিজ্যিক নগরী  হিসেবে বরিশালকে প্রতিষ্ঠিত করবো।
কেউ কেউ অবশ্য চরমোনাই পীরের ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীর হাতপাখা প্রতীক নিয়েও কথা বলেছেন। তাদের মতে, বিগত ২০১৮ সালের নির্বাচন যেমনই হোক হাতপাখার ভূমিকা ছিলো প্রশংসনীয়। যেহেতু চরমোনাই পীরের বাড়ি বরিশাল তাই এবার নির্বাচন স্বচ্ছ হলে হাতপাখার বাতাসেই ভর করতেন পারেন নগরবাসী। এ ব্যাপারে ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির ও বরিশাল মহানগর কমিটির সভাপতি সৈয়দ ফয়জুল করিম বলেন, আমাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করে রাখা হয়েছে। আগামী ২/১ দিনের মধ্যেই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তা জানিয়ে দেওয়া হবে।
দখল হয়ে যাচ্ছে সাম্রাজ্য: দখল হয়ে যাচ্ছে মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর অনুসারীদের সাম্রাজ্য। সাদিক বিরোধীরা একে একে দীর্ঘদিনের দখলে থাকা স্পিডবোট ঘাট ও বাসষ্ট্যান্ড এলাকা দখল করে নিয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে বর্তমান মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাননি। এরপর থেকেই সাদিক আব্দুল্লাহর অনুসারীদের নিয়ন্ত্রিত ঘাট ও টার্মিনাল দখল করে নিয়েছেন সাদিক বিরোধীরা। সূত্রমতে, গত শনিবার সন্ধ্যায় নগরীর রূপাতলী বাস টার্মিনাল সংলগ্ন থ্রি হুইলার স্ট্যান্ড ও মাইক্রোবাস স্ট্যান্ডে মহড়া দিয়ে দখল করে নেন জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান সুমন মোল্লা ও সহ সভাপতি রফিকুল ইসলাম মানিক।
সুমন মোল্লা বলেন, এই দুটি স্ট্যান্ড থেকে প্রতিনিয়ত চাঁদাবাজি করতো সাদিক অনুসারী মীর রনি। সাধারণ মানুষ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের ওপর অনেক নির্যাতন করা হয়েছে। তাই সর্বস্তরের মানুষের ভোগান্তি লাঘবে আমরা দুটি স্টান্ডকে চাঁদাবাজমুক্ত করেছি।
সাদিক আব্দুল্লাহর অনুসারী রূপাতলী মিনিবাস টার্মিনালের শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি পরিমল চন্দ্র দাস বলেন, মেয়র সাদিক দায়িত্ব নেয়ার আগে এখানে যারা চাঁদাবাজি করতো তারাই এখন আবার এর দখল নিতে মহড়া দিচ্ছে। মাত্র মনোনয়ন ঘোষণা হলো, এখনই এই পরিস্থিতি। ভবিষ্যতে কী হবে তাতো বোঝাই যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আগামী ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত মেয়র থাকবেন সাদিক আব্দুল্লাহ। তাছাড়া বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তিনি। অথচ এদের আচরণে মনে হচ্ছে বরিশাল থেকে আমরা উৎখাত হয়ে গেছি।
সূত্রে আরও জানা গেছে, রোববার  রাতে নগরীর স্পিডবোট ঘাট দখল করে নিয়েছেন সাদিক বিরোধী আওয়ামী লীগ কর্মী সাদ্দাম হোসেন শাহ ও তার অনুসারিরা। তারা প্রতি স্পিটবোট থেকে ট্রিপ প্রতি আদায় করা ১০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।
সাদ্দাম হোসেন বলেন, উদ্দেশ্যে প্রণোদিতভাবে মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক এবং মেয়র সাদিকের ক্যাশিয়ার নিরব হোসেন টুটুল আমাদের মালিকানাধীন ১০টি স্পিডবোট বন্ধ করে দিয়েছে। এরপর থেকে আমরা মানবেতর জীবনযাপন পালন করে আসছি। তাই বাধ্য হয়ে আমরা ঘাটে অবস্থান নিয়ে টুটুলের অনুসায়ীদের চাঁদা নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। সোমবার সকাল থেকে সঠিক নিয়মে বোট চলাচল করছে।
১০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখর দাস খোকন বলেন, দীর্ঘদিন থেকে আমাদের বোট চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে নিরব হোসেন টুটুল। তিনি আরও বলেন, যে টুটুল একসময় নৌকার মিছিলে গুলি করছিলো, সেই টুটুল মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর আর্শীবাদে আওয়ামী লীগের পদ পদবী বাগিয়ে নিয়ে নেতাকর্মীদের পেটে লাথি মারছে। টুটুল স্পিডবোট ঘাটে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করে আসছিলো।
এই বিষয়ে সাদিক আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত নিরব হোসেন টুটুল বলেন, স্পিডবোট ঘাটে আমার কোনো বিষয় নেই। সেখানে চলাচলকারী স্পিডবোটগুলো দিয়ে চার থেকে পাঁচশ টাকা করে চাঁদা নিতো সাদ্দাম ও তার লোকজনে। বিষয়টি সর্ম্পকে মেয়র মহোদয়ের কাছে অভিযোগ গেলে তিনি চাঁদাবাজ সাদ্দামের স্পিডবোটগুলো চলাচল বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। একইসাথে চাঁদাবাজমুক্ত করা হয় স্পিডবোট ঘাট।
অপরদিকে সোমবার সকাল থেকে বরিশাল কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল নথুল্লাবাদে মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ অনুসারীদের দেখা মেলেনি। জেলা বাস মালিক গ্রুপের সাবেক সভাপতি আফতাব আহম্মেদের অনুসারীরা এই বাস টার্মিনাল অনেকটাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। বাস মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক কিশোর কুমার দে বলেন, টার্মিনালে কিছু নতুন মুখের আনাগোনা শুরু হয়েছে। তবে এরা কারা তা বলতে পারবো না।
মনোনয়ন পাওয়া মেয়র প্রার্থী খোকন সেরনিয়াবাতের পক্ষে নগরীতে রোববার  রাতে আনন্দ মিছিল করে বি এম কলেজের সাবেক ভিপি মঈন তুষার বলেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রদানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরিশালে নৌকার মনোনয়ন ঘোষণার মধ্য দিয়ে নগরবাসীকে অভিশাপমুক্ত করেছেন। বর্তমান মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ দিনে ঘুমান রাতে বাসায় বসে অফিস করেন। তার বাসায় বসেই সিটি কর্পোরেশন আর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। সব জায়গায় তার দখল দারিত্ব ছিলো। নগরবাসী এখন আনন্দে আত্মহারা সাদিক আব্দুল্লাহর পতনে। ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জিয়াউর রহমান বিপ্লব বলেন, বরিশাল নগরবাসী যে জিম্মিদশার মধ্যে ছিলো সেটা প্রধানমন্ত্রী বুঝতে পেরে ক্লিন ইমেজের ব্যক্তিত্ব খোকন সেরনিয়াবাতকে মনোনয়ন দিয়েছেন।

 

Side banner