Daily Poribar
Bongosoft Ltd.
ঢাকা সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১১ ফাল্গুন ১৪৩২

গাইবান্ধার প্রকৃতি রাঙ্গাচ্ছে ফাগুনের আগুন ঝরানো শিমুল ফুল


দৈনিক পরিবার | শাহিন নুরী  ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬, ১১:৪২ এএম গাইবান্ধার প্রকৃতি রাঙ্গাচ্ছে ফাগুনের আগুন ঝরানো শিমুল ফুল

তুমি আমায় ভুলে গেছ তাতে কোন দুঃখ নাই কিন্তু প্রকৃতির বসন্তকালে ফাগুনের আগুন ঝরা ছয় ঋতুর এক ঋতুতে ঠিকই তোমার কাছে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। শব্দচয়ন গুলো মধুর হলেও এটি কোন লেখকের কথা নয় এটি বলছি বসন্তের ফাগুনে আগুন ঝরানো লাল শিমুল ফুলের কথা। ষড়ঋতুর বাংলায় শীতের জরাজীর্ণতাকে ঝেড়ে অপরূপ রূপে প্রকৃতিকে সাজাতে এসেছে ঋতুরাজ বসন্ত। তারই সংকেত দিতে ফুটেছে আগুনরাঙা লাল শিমুল ফুল। বসন্তের শুরুতেই শিমুল ফুলের স্বর্গীয় সৌন্দর্যে নান্দনিক হয়ে উঠেছে প্রকৃতি। বসন্ত এলেই যেন ভালোবাসার কথা জানান দিতে প্রকৃতিকে রাঙিয়ে দিয়ে হেসে ওঠে শিমুল ফুল। তাই ঋতু চক্রের আবর্তনে শিমুল ফুল তার মোহনীয় সৌন্দর্য নিয়ে আবারো হাজির হয়েছে প্রকৃতির মাঝে। শিমুল ফুলের লাল আবির বসন্তকে দিয়েছে এক অনন্য মাত্রা। প্রকৃতির এই অপরূপ রঙের সাজ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায় যে মানুষের ।তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় ও উন্নয়নের ধারায় প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও এ গাছটি হারিয়ে যেতে বসেছে। গ্রাম বাংলার পথে প্রান্তরে এখন আর এ ফুল তেমন চোখে পড়ে না। অথচ কয়েক বছর আগেও গ্রামের মেঠোপথে ও বাড়ির আঙিনায় দেখা যেতো শিমুল গাছ।শিমুল ফুল শুধু সৌন্দর্য বর্ধনই করে না। শিমুল গাছের রয়েছে নানা উপকারিতা। এর রয়েছে নানা ভেষজ গুণ। পেটের পীড়াসহ নানা রোগে এ গাছের ছাল ব্যবহার হয়।বসন্তের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের প্রকৃতিতে শিমুল ফুলের লাল রঙের আভা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। আমরা বাংলার বসন্তে এই রক্তে রাঙা শিমুল ফুল অনন্তকাল ধরে দেখতে চাই। শিমুল ফুল বসন্তকালের ফুল। এ ফুলই মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় বসন্ত এসেছে। এটি মালভেসি গোত্রের ফুল। তবে নানা কারণে এই গাছ হারিয়ে যাচ্ছে। গাইবান্ধার প্রকৃতিতে শিমুল ফুলের গাছগুলো টিকিয়ে রাখতে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছে প্রকৃতি প্রেমি নানা পেশাজীবী মানুষ।ঋতুরাজ বসন্ত এলেই প্রকৃতিপ্রেমীদেরকে আকৃষ্ট করে থাকে শিমুল ফুল যার প্রেমে বিমুগ্ধ হয়ে নানা কবিতা লিখে প্রাণের আস্বাদন মিটাতো কবিতা প্রেমিরা। কবির কল্পনা জগতকেও আলোড়িত করতো শিমুল গাছের সৌন্দর্য । নয়নাভিরাম সৌন্দর্য ও শিমুলের রঙিন ফুলে শালিখার প্রত্যন্ত অঞ্চল আচ্ছাদিত করে রেখেছে ।
নির্বচারে বৃক্ষ নিধন ও অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে শিমুল গাছের সংখ্যা প্রায়ই কমে গেছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও তুলার যোগানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শিমুল গাছের কদর অনেক আগে থেকেই। শিমুল গাছের নানা গুণ থাকার কারণে গাছটিকে বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছে বোম্ববাক্স সাইবার লিন এটা বোমবাকাসিয়াক পরিবারের উদ্ভিদ। কিন্তু কালের বিবর্তনে আগুন ধরা ফাগুনে চোখ বাঁধাননো গাড়ো লাল রঙের অপরূপ সাজে সজ্জিত শিমুল গাছ এখন বিলুপ্তপ্রায়। বীজ ও কান্ডের মাধ্যমে এর বংশবিস্তার হয়। গাছটি ৮০ থেকে ১০০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে গাছটি বেঁচে থাকে অনেক দিন। শীতের শেষে পাতা ঝরে পড়ে, বসন্তের শুরুতেই গাছে লাল লাল ফুল ফুটে থাকে দেখে যেন মনে হয় নববধূ রঙ্গিন পুষ্পে আচ্ছাদিত করে রেখেছে নিজেকে। গাছটি অনেক উঁচু হওয়ায় অনেক দূর থেকে গাছটির মনোরম দৃশ্য চোখে পড়ে। শিমুল গাছের ফুল থেকেই হয় ফল, চৈত্র মাসের শেষের দিকে ফল পুষ্ট হয় বৈশাখ মাসের শেষের দিকে ফল পেকে বাতাসে আপনা আপনিই ফল ফেটে প্রাকৃতিকভাবে বাতাসের সাথে উড়ে উড়ে দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। বীজ থেকেই এ গাছের জন্ম, প্রাকৃতিক ভাবেই বেড়ে ওঠে, অন্য গাছের মতো শখ করে এই গাছগুলো কেউ রোপন করে না।গাইবান্ধায় জেলার  উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গাছটি এখন আর আগের মত চোখে পড়ে না। স্থানীয়ভাবে গাছটি মান্দার গাছ বলে পরিচিত যার অর্থ বড় গাছ। ফুলছড়ি  ইউনিয়নের প্রবীণ ব্যক্তি আনোয়ার ও হাওয়া বিবীসহ স্থানীয় কয়েকজন লোকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লেপ, তোষক, বালিশ তৈরিতে শিমুল গাছের জুড়ি নেই শিমুল গাছের তুলা অনেক ভালো পাশাপাশি এই গাছের ছাল, পাতা, ফুল শিকড়ের নানা গুণের কথাও জানান তারা। গাইবান্ধায় সদরের কাচারি বাজারের তুলা ব্যবসায়ী হাসান আলী জানান, শিমুল গাছের তুলা সর্বোৎকৃষ্ট তুলা। আগে গাছের সংখ্যা অনেক ছিল তাই শিমুল গাছের তুলা কম দামে পাওয়া যায় যেত তবে বর্তমানে শিমুল গাছের সংখ্যা অনেক কমে যাওয়ায় এ গাছের তুলার দাম অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবছর বৃক্ষ রোপন কর্মসূচির আওতায় অন্যান্য গাছের ন্যায় প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলের প্রতিটা মোড়ে মোড়ে একটি করে শিমুল গাছ রোপন করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাতে করে নতুন প্রজন্ম শিমুল গাছ ও তার নানাবিধ গুনের কথা জানতে পারবেন বলেও মনে করছেন তারা। বিগত এক যুগ আগেও গাইবান্ধা সদর  উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের আনাচে কানাচে মোড়ো মোড়ে শিমুল গাছ দেখা যেত খুব। তবে এখন আর তা আগের মতো চোখে পড়ে না ।
প্রস্ফুটিত শিমুল ফুল এখন আর আগের মতো বসন্তের শুভাগমনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় না । বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী আকবর মিয়া বলেন বসন্ত এলেই প্রকৃতিতে শিমুলের লাল লাল ফলে বৃক্ষরাজ এক নতুন সাজে সজ্জিত হতো কিন্তু এখন আর তেমনটি চোখে পড়ে না তবে বিলুপ্তপ্রায় এ গাছগুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নিরীক্ষার মাধ্যমে আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি। গাইবান্ধা জেলার বন কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, শিমুল, দেবদারু, সোনালী, বটগাছ সহ যে সকল গাছ বিলুপ্তির পথে খুব অল্প দিনের মধ্যে আমরা ঢাকা থেকে ঐসব গাছ সংগ্রহ পূর্বক গাইবান্ধা সদর উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে রোপন করবো পাশাপাশি উপজেলার ১৩ টি ইউনিয়নকে বৃক্ষে আচ্ছাদিত একটি মডেল ইউনিয়নে পরিণত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। মাঠে প্রান্তরে এখনো যে শিমুল ফুলের গাছ গুলো আছে সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি আরো বেশি বেশি শিমুল ফুল গাছ লাগাতে হবে। তাহলে প্রকৃতির বসন্তের ফাগুন পাবে শিমুল ফুলের পরিপূর্ণ পূর্ণতা।

Side banner