Daily Poribar
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৪, ৩ শ্রাবণ ১৪৩১
ধন্যবাদ লুই পাস্তুর সাহেব

লুই পাস্তুরের গবেষণায় আজও আমি বেঁচে আছি


দৈনিক পরিবার | আশীক মোহাম্মদ শিমুল, পিএইচডি সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৩, ০৯:৫৬ পিএম লুই পাস্তুরের গবেষণায় আজও আমি বেঁচে আছি

তখনকার সময়টা ছিল ডিসেম্বর মাস ১৯৮৬ সাল। বয়স আমার কতো হবে, এই ধরুন ৫ বছর হবে। নরেশ কাকার বাড়ীর পাশে খড়ের বড় গাদার নীচে মাটির গর্তে বেশ কয়েকটা কুকুরের বাচ্চা ছিল, তাদের মধ্যে একটাকে আমরা বেশ আদর করতাম, কোলে নিতাম, ভাতের মাড় খাওয়াতাম, মুড়ি খাওয়াতাম আরো কত্তো কি! লালচে গায়ের রং আর চোখের নীচে ছোট দুটো হলদেটে রঙের ফোঁটা। ঐ সময়টাতে রাখাল কাকাদের ঘরের পাশে কিংবা কর্মকার বাড়ীর রায়ধণ দাদাদের ভার বাড়ীতেও কুকুরের ছানা দেখতে পেতাম। রোজকার মতো সকাল বেলা বাড়ি থেকে বের হয়ে পকেটে কিছু মুড়ি নিয়ে সকালের সোনা ছড়ানো রোদ পোহাতে গোপাল দাদার বাড়ী পার হয়ে চলে এলাম ফনি কাকাদের বাড়ী। ফনি কাকাদের বাড়ীতে উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম চার ভিটেতেই চারটা ঘর, বাড়ীর উঠোনটা বেশ বড়। উত্তরের ঘরটাতে থাকেন সুরেশ কাকা, পূর্বদিকের ঘরটাতে ফনি কাকা এবং হরিপদ জেঠা দুজন থাকেন। আর বাকী দুটো ঘর ব্যবহৃত হতো তাদের জমিজমা থেকে প্রাপ্ত ধান-চাল রাখার জন্য। বৈকুন্ঠ দাদা গাঢ় গ্রীণ রঙের একটা শীতের টুপি মাথায়, পড়নে সাদা ধুতি, আর গায়ে জড়ানো বাদামী রঙের একটা চাঁদর। ছোট্ট চৌকিতে বসে রোদটাকে পীঠ দেখিয়ে বেঁতের তৈরী একটা বাটি'তে (আমাদের গ্রাম বাংলায় একে বলে ‘পুরা’) করে মুড়ি খাচ্ছেন।
বৈকুন্ঠ দাদা, পুরো নাম বৈকুন্ঠ দেব নাথ। আমাদের পাড়ায় ফনি কাকা’র বাবা আর আমাদের স্বপন ভাই, শেফালী আপু, তপন ভাই, সন্ধা আপু, নারায়ণ ভাই, গৌতম, সুমন, দীপক, শ্যামল এদের সবার দাদু। শুধু ফনি কাকার বাবা বললে সুরেশ কাকা, হরিপদ জেঠা, মিনতি ফুপু তারা রাগ করতে পারেন তবুও বলছি কারণ ফনি কাকা’র সাথে আমাদের সখ্যতা ছিল বেশ। ফনি কাকা আমার আব্বার বাল্য বন্ধুছিলেন। কাকার পুরো নাম ফনিভূষণ দেব নাথ। আমার আব্বা (আবদুল হাকিম, বাঞ্ছারামপুরে আব্বা মাক্কু স্যার বা হাকিম বিএসসি নামে সুপরিচিত) এবং এই ফনি কাকা একসাথেই পড়াশোনা করেছন। দারুন সম্পর্ক ছিল দুজনের মধ্যে। ফনি কাকা নারায়ণগঞ্জে থাকতেন, কাপড়ের রঙ্গের ব্যবসা করতেন কিন্তু যতবার বাড়ী আসতেন আমাদের বাড়ীতে আসতে কোনদিন ভুলতেন না। আজ দুজনের কেউই আমাদের মাঝে নেই, ফনি কাকাও নেই আব্বাও নেই! দুজনেই পাড়ি জমিয়েছেন ওপারে, তবে ফনি কাকা আমার আব্বাকে ফেলে আগেভাগেই চলে গেছেন।
যাক সে কথা, বৈকুন্ঠ দাদা আমাকে বেশ আদর করতেন। আমি ৮ম শ্রেণীতে উঠেই বাড়ীর বাইরে থাকতাম এবং যতবার বাড়ীতে বেড়াতে যেতাম দাদুর সাথে দেখা না করে আসতাম না। দাদুর সাথে আমার একটা ছবি ছিল, সম্ভবত বাড়ীতে খোঁজ করলে এখনও পাওয়া যাবে। ঈদ্গাহ’র পাশে তখন নতুন সড়ক হয়েছে, ঐ সড়কে শেষ বিকেলে দাদুর সাথে দাঁড়িয়ে একটা ছবি তুলেছিলাম, বেশ মনে পড়ছে। যাই হোক, তার কুচকানো হাতের চামড়া দেখে কতো বার বলেছি দাদু “তোমার হাতের চামড়া এতো মসৃন কেন?” দাদু হাসতে হাসতে বলতেন- “তুই বুড়ো হলে তোরও হবে”। দাদুর হাতের চামড়াটা একটু চেপে ধরলেই কুচকানো চামড়ায় দেখা যেতো হরতনের আকার। দাদুর চোখে পুড়ো ল্যন্সের চশমা, ফ্রেমটা প্লাস্টিকের, পেছনে সুতা লাগানো যেন চোখ গলে পড়ে গেলেও গলায় আটকে থাকে, মাটিতে পরে ভেঙ্গে না যায়। সম্ভবত ফনি কাকা নারায়ণগঞ্জ থেকে ডাক্তার দেখিয়ে দাদুর চশমার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
এবার আসি মূল ঘটনায়, তো রোজ সকালের মতো আজও আমি কুকুরের ছানাটাকে আদর করতে করতে কোলে তুলে নিতেই ঘপ করে কামড় বসিয়ে দিল আমার বাম হাতের উপর। একেবারে সেই রকমের কামড়! বাম হাতের বুড়ো আঙ্গুলের উপর থেকে কনিষ্ঠার গোঁড়া পর্যন্ত এক কামড়ে চামড়া সহ মাংস তুলে নিয়ে গেছে। ব্যাটা ছানা হলে কি হবে, কামড় বসিয়ে একেবারে হাতের সাথে লেগেছিল। প্রচণ্ড ব্যথা এবং ঘটনার আকস্মিকতায় হাতটা ছিটকে দিতেই কুকুর ছানাটা মাটিতে লুটিয়ে পরলো। পাশেই বসা বৈকুণ্ঠ দাদা চেঁচিয়ে উঠলেন “আরে করলি কি! আরে করলি কি!!” দাদুর চেঁচিয়ে উঠায় আমাদের কাছেই মনে হয় ছিলেন ফনি কাকার বড় ছেলে নারায়ণ ভাই, নিমিষেই হাজির। তিনি আমার বাম হাতের উপর চাপ দিয়ে ধরে রক্ত পড়াটা বন্ধ করার চেষ্টা করতে করতে আমাকে নিয়ে এক দৌঁড়ে পৌঁছালেন আমার বাড়ী। ঐ সময় আমার আম্মা (লায়লা মাশরেকী) ব্যস্ত ছিলেন দুপুরের রান্নায়। আমার মনে আছে, আম্মার হাতে ছিল ভাতের হাড়িতে চাল নাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত কাঠের একটা চামচ। নারায়ণ দা চিৎকার করে বলছিলেন “কাকী, কাকী শিমুলকে কুকুরে কামড় দিয়েছে”। আম্মা তৎক্ষণাৎ আমাকে তার হাতে থাকা কাঠের চামচটা দিয়ে কষে দুটো লাগিয়ে দিলেন আমার পিঠে আর বলতে লাগলেন “কুকুর ধরতে গিয়েছিলি কেন?” তখন ভাবতে পারি নি, এখন ভাবছি- ছেলেকে কুকুরে কামড়েছে, কোথায় একটু মায়া মাখিয়ে বুকে জড়িয়ে হন্তদন্ত হয়ে দেখবে আর বলবে- কোথায়, কোথায় দেখি! না, সবার আগে ঐ যে মাইরের উপরে ওষুধ নাই। মায়ের ওষুধ আগে লেগেছে তারপর অন্য কিছু। আম্মা যে যারপর নাই ঘাবড়ে গিয়েছিলেন সেটা এখন মর্মে মর্মে টের পাই। যাই হোক, হাতটা সেভলন দিয়ে পরিষ্কার করে আম্মার অফিস থেকে পাওয়া সরকারী ওষুধ লাগিয়ে দিলেন। ইতিমধ্যেই আমার বুবু, মানে আমার দাদী (আমাদের বুবুর নাম ছিল নূরের নেছা, আমরা সব ভাই বোনেরা আমাদের দাদী কে 'বুবু' বলেই ডাকতাম) এসে হাজির, পুরো পাড়ায় রটে গেল আমাকে কুকুরে কামড় দেবার ঘটনা। ওহ! এখানে বলে রাখা বাঞ্ছনীয় যে, আমার এই ঘটনার প্রায় এক দেড় মাস আগে আমাদের পাশের পাড়ার রবীন্দ্র স্যারের ছেলে (১৪ কি ১৫ বছর বয়স হবে ছেলেটার) এই একই ধরনের ঘটনায় জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে পরলোক গমন করেছেন। হ্যাংলা পাতলা লিকলিকে শরীর ছিল ছেলেটার। মারা যাবার আগে নাকি ঐ ছেলেটা পানি খেতে চাইতো কিন্তু পানি দেখলেই আর খেতে পারতো না, পানিতে নাকি কুকুরের ছবি দেখতে পেতো। এগুলো আমি অন্যের মুখে শুনেছি। ঐ ছেলেটার মৃত্যু আমার বাবা-মা এবং আমার পুরো পরিবারকে সচেতন করে দিয়েছিল।
আমার এই কুকুরের কামড় যেন আমাদের পুরো পরিবারের উপর ভয়ংকর এক দানবীয় আঘাত হানলো। সবাই এখন আমাকে কিভাবে বাঁচানো যায় সেই সংগ্রামে দিগবিদিক ছুটাছুটি করছেন। আমার দাদী এসে আমাকে নিয়ে ছুটলেন আইরা মিস্ত্রী’র (লোকটার পুরো নাম কিংবা ভাল নাম কি সেটা জানার চেষ্টা করেছি কিন্তু পারি নি, তাই লোকে যে নামে এই বাড়ীটাকে ডাকতো সেটাই এখানে লিখতে হচ্ছে) বাড়িতে, উদ্দেশ্য হল আমাকে ‘থালা-পড়া’ দেয়া হবে। ‘থালা-পড়া’ হল এমন এক বিশেষ ধরণের দেশীয় আধ্যাত্মিক চিকিৎসা যেখানে একজন কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে একটা কাঠের পিরিতে খালি গায়ে বসিয়ে রেখে তার পিঠে একটা পিতলের থালা রেখে কিছু তন্ত্রমন্ত্র পাঠ করা হবে এবং এই তন্ত্রমন্ত্র পাঠের ফলে শরীরের জমে থাকা কুকুরের বিষ সব ঐ থালায় চলে আসবে এবং আক্রান্ত ব্যক্তি বিষমুক্ত হবেন, বেঁচে যাবেন। আমাকেও তাই করা হলো, তথাকথিত বিষক্ষয় কাজ শেষে বাড়ী ফিরে গেলাম দাদীর সাথে।
আব্বা তখন বাঞ্ছারামপুরের সোনালী ব্যাংকে চাকরী করছেন। বিকেল নাগাদ আব্বা বাড়ী এসে জানতে পারেন পুরো ঘটনা। আম্মা চা বানিয়ে দিতে দিতে সব কিছু জানা শেষ হয়েছে আব্বার। তখন আব্বার চেহারার দিকে তাকানোর সময় আমার নেই, কিংবা তাকালে বুঝে উঠার ক্ষমতা আমার হয়নি যে, সন্তানের সমূহ বিপদে বাবা-মায়ের মনের অস্থিরতা চেহারায় ফুটে উঠে স্পষ্ট হয়ে। এইটুকু মনে আছে যে, আব্বা খুঁজতে বের হয়েছেন যে কুকুরটা কোথায়? বাঞ্ছারামপুরের থানা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, ডক্টর ইসহাক সাহেব আব্বাকে কোন এক কথোপকথনে বলেছিলেন যে, কুকুরে কামড় দেবার পর যদি দেখেন যে কুকুরটা মরে গেছে তবে এই বিষয়ে আপনি কোন সন্দেহ রাখবেন না যে কুকুরটা জলাতঙ্কে আক্রান্ত। আমার বাবা প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী মানুষ ছিলেন, যথা সময়ে ঐ কথোপকথনের রেশ মনের কোনে উঁকি দিয়েছে আর আব্বা নেমে পড়েছেন ছেলেকে কামড়ানো কুকুর খুঁজতে। কুকুরটা ঐ দিন পর্যন্ত বেঁচে ছিল, তারপর দিন সকালে নরেশ কাকাদের বাড়ীর পূর্বদিকের বড় ডোবার পাশে কুকুরটাকে মরে পড়ে থাকতে দেখেছেন আব্বা। শীতের সময় ছিল তাই ডোবায় পানি ছিল না। কুকুরটার মৃত্যু যেন আব্বার মনে আমার মৃত্যুর আশংকাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। এমনিতেই সারা রাত আম্মা আর আব্বা হারিকেনের সোনালী রঙের আলোয় আমার মুখের দিকে চেয়েছিলেন। তখন আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না, হারিকেনের আলোই রাতের পৃথিবী দেখার একমাত্র উপায়। আমি শুয়ে আছি আমাদের ঘরের বড় খাটের দখিনের জানালাটার পাশে। সুতীকাপড়ের একটা মশারী টানানো ছিল। আব্বা-আম্মা গুনছিলেন রাতের প্রতিটা প্রহর আর বারংবার নাকের কাছে আঙ্গুল নিয়ে চামড়ায় অনুভব করছিলেন আমার বেঁচে থাকার শ্বাসটা চলছে তো? আমার মধ্যে কোন অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছে না তো?  অপেক্ষার সময় বড্ড দীর্ঘ হয় সেটা আমাদের সবার জানা কিন্তু সন্তানের জীবনের শ্বাস গুনতে গুনতে সময় গোনা হয়ত মন্থরতার চরম সীমাকেও অতিক্রম করে। তখন বাবা’র কষ্ট কিংবা মনোজগৎকে দেখার বা সেটা নিয়ে ভাবার সময় আমার হয়ে উঠেনি, কিন্তু আজ নিজেকে বাবার অবস্থানে রেখে ঐ সময়টার কথা ভাবতে গেলে গাঁয়ে কাটা দেয়, লোম দাঁড়িয়ে যায়।
বাঞ্ছারামপুর থানার হাসপাতাল থেকে আমার জন্য জলাতঙ্ক রোগের ঔষধ আনা হল দুই শিশি। আমাদের গ্রামে তখনকার সেরা ডাক্তার একজনই, নাম- ডাক্তার ওয়ালিউল্লহা। ইয়া লম্বা শরীর, গায়ের রং কালো, তবে বেশ সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন ডাক্তার সাহেব, কথা বলতেন কিছুটা টেনে টেনে যেমনটা পূর্বাঞ্চলীয় মানুষেরা বলেন। সব সময় চলাফেরা করতেন একটা সাইকেলে করে। সাইকেলটার সামনে একটা সিলভার রং এর হেডলাইট ছিল সেটাও মনে আছে। যাক, ডাক্তার সাহেব থাকেন উত্তরপাড়ায়, আমাদের বাড়ী থেকে প্রায় ১ মাইল দূরত্বে। আমাকে নিয়ে আব্বা গেলেন ডাক্তার ওয়ালিউল্লাহ সাহেবের বাড়ীতে। তিনি ঔষধের শিশি দুটো দেখেই বলেদিলেন “এই ঔষধ নষ্ট হয়ে গেছে, শিশির নীচে তলানি পড়ে গেছে, এটা দেয়া যাবে না”। আব্বার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। সাথে সাথে আমার চাচাকে ঢাকায় পাঠানো হলো মহাখালী থেকে ঔষধ আনার জন্য। চাচা কাল বিলম্ব না করে রামচন্দ্রপুর হয়ে কিভাবে কিভাবে যেন খুব তাড়াতাড়ি ওষুধ নিয়ে পরের দিন হাজির হলেন বাড়ীতে। কিন্তু এই টিকা দিতে হবে ফ্রিজে রেখে, আর বাঞ্ছারামপুর হাসপাতাল ছাড়া কোথাও ফ্রিজ নেই। তাই আব্বা সিদ্ধান্ত নিলেন আমাদের পুরো পরিবারকে নিয়ে বাঞ্ছারামপুর চলে আসবেন। বাঞ্ছারামপুর এস এম পাইলট স্কুলের উত্তর-পূর্ব কোনায় গোবিন্দ ভবনের পূর্বদিকটার দুই রুমের বাসা ভাড়া করা হল। একদিনের নোটিশে আমরা বাক্স-পেট্রা গুছিয়ে বাঞ্ছারামপুর চলে আসলাম।
শুরু হল আমার ১৪ দিন ব্যাপী চিকিৎসা কর্মশালা। তেমন বিশাল কর্মযজ্ঞ নয়, শুধু রোজ সন্ধ্যায় একটি করে ইনজেকশন। টিকার নাম জানি না তবে তাকে বলা হতো ‘জলাতঙ্ক রোগের টিকা’। চিকিৎসকের ভূমিকায় রয়েছেন ডাক্তার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনিও ডাক্তার ওয়ালিউল্লাহর মতো বেশ লম্বা, মুখে লম্বা দাড়ি এবং চোখে পুরো ল্যান্সের চশমা। রোজ সন্ধ্যাবেলা, মাগরিবের নামাজের পর আব্বা আমাকে জোর করে ধরে নিয়ে যেতেন শহীদ ডাক্তারের ফার্মেসীতে। আমি যেতে চাইতাম না, কারণ সন্ধ্যা মানেই নাভির গোঁড়ায় একটা শুইয়ের খোঁচা। যখন নাভিতে ইনজেকশন পুষ করতেন তখন সেটা ফুলে যেতো, বেশ ব্যথাও হতো। আজ নাভির বাম পাশে তো কাল ডান পাশে, পরশু উপরে তো তারপরের দিন নীচের দিকে, এভাবে করে চলতে থাকলো ইনজেকশনের অত্যাচার। এতো ছোট বয়সে এমন অসহ্য যন্ত্রণা, তাও প্রতিদিন সন্ধ্যায়! রীতিমতো আতংকে থাকতাম। এভাবে কেটে গেল একে একে ১৪ দিন।
লুই পাস্তুর সাহেব, আপনার কাছে ঋণ শোধ করার কোন ক্ষমতা আমার নেই। আমি চির কৃতজ্ঞ আপনার কাছে। জীবনের অনেক মূল্যবান সময় খরচ করে, নিজের মেধার সর্বোচ্চটাকে কাজে লাগিয়ে, বহু রাতকে দিন আর দিনকে রাত করে আপনি আবিষ্কার করেছিলেন এই জলাতঙ্ক রোগের টিকা। আপনিই চিন্তা করেছিলেন যে কুকুরের মতো একটা প্রাণী মানুষকে কামড় দিলে তার ফলশ্রুতিতে মানুষের নার্ভাস সিস্টেমে একটি অস্বাভাবিক পরিবর্তন হয় যার নাম ‘জলাতঙ্ক’ এবং এতে মানুষ মৃত্যুবরণ করতে পারে। কেন সেটা হয়? আর কিভাবে আমরা সেটা থেকে মুক্ত হতে পারি? এই ধরনের চিন্তায় আপনি ‘র‌্যাবিস ভাইরাসের’ ব্যবহারে যে এই অস্বাভাবিকতা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় সেটা আপনার গবেষণাগারে একটি ছেলের উপর প্রয়োগ করে তার জীবন বাঁচিয়েছিলেন। যে ক্ষণটিতে আপনি চিন্তা করেছিলেন এমন কালজয়ী ভাবনা সেই ক্ষণটিতেই হয়ত আমার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা শুরু হয়েছিল। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আস্থা, অজানাকে জানার কৌতূহল, সমস্যাকে সমাধানের নিরন্তর চেষ্টায় পৃথিবীতে আপনার মতো মানুষেরা কতো কিছু করেছে, করছে এবং ভবিষ্যতে আরও করবে। আপনি হয়তো জানতেন না যে বাংলাদেশের কোন এক অজ পাড়াগাঁয়ের রূপসদী গ্রামের হাকিম স্যার এবং লায়লা মাশরকীর ছোট ছেলে আপনার এই টিকার জোরে জীবন ফিরে পাবে। আপনার আবিষ্কারের ফলে আমি যাপন করেছি জীবনের মহামূল্যবান ৩৫টি বছর, রাব্বুল আলামীন যদি চান তবে আরও কিছু বছর হয়তো বেঁচে থাকব।  
লুই পাস্তুর সাহেব, আজ প্রায় ৩৩ বছর পর আমি এবং আমার পরিবার সবাই আপনাকে জানাই লাল সালাম। সেই সাথে আমি ধন্যবাদ জানাই আমার বুবু, আমার চাচা (আব্দুল হামিদ), বৈকুণ্ঠ দাদু, নারায়ণ দা, আইরা মিস্ত্রী, ডক্টর ওয়ালিউল্লাহ, ডক্টর ইসহাক, ডক্টর শহীদুল্লাহ আপনাদের সবাইকে কারণ ঐ সময়ে আপনাদের কিছু সময়, আপনাদের ছোট্ট একটা পরামর্শ, ছোট্ট একটা কাজের বদৌলতে আজও আমি বেঁচে আছি। সবশেষে আমার আম্মা এবং আমার আব্বা তাদের ধন্যবাদ নয়, কারণ পৃথিবীতে এমন কোন কৃতজ্ঞতাসূচক শব্দও তৈরি হয়নি যা দিয়ে বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো যাবে, এটা অনুভবের, এটা অস্তিত্বের। শুধু এটুকুই বলবো “আপনাদের অশেষ ভালোবাসায় আজও বেঁচে আছি”।

আশীক মোহাম্মদ শিমুল, পিএইচডি  
সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, অস্ট্রেলিয়ান ডিফেন্স ফোর্স
ক্যানব্যারা, অস্ট্রেলিয়া

Side banner