Daily Poribar
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ১০ ফাল্গুন ১৪৩০
কালবেলায় কালপুরুষের উত্তরাধিকার

আমার সমরেশ


দৈনিক পরিবার | সুমন জাহিদ মে ১২, ২০২৩, ১১:৪৪ এএম আমার সমরেশ

কয়েকটি ট্রিলজি আমাদের প্রজন্মের মনগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রথম তারুণ্যের দিনগুলোতে আমরা দারুণ রাজনৈতিক রোমান্টিসিজমে ভূগতাম যা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে মূলত ২টি ট্রিলজি সুনীলের সেই সময়-প্রথম আলো-পূর্ব পশ্চিম আর সমরেশের উত্তরাধিকার - কালবেলা - কালপুরুষ। এর সাথে পরে যুক্ত হয়েছে সঙ্গীত ট্রিলজি সুমন - নচিকেতা - অঞ্জন।
রাষ্ট্রীয়ভাবে যেহেতু 'জয় বাংলা' ও 'বঙ্গবন্ধু' শব্দদ্বয় নিষিদ্ধ তাই আমরা অনিমেষ হতে চাইতাম যে অনিমেষ নকশাল বাড়ির রোমান্টিক সমাজতন্ত্রে নয় বঙ্গবন্ধুর সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী।  গ্লোবাললি প্রচলিত ও প্রয়োগিত বিধিবদ্ধ 'সমাজতন্ত্র' ও 'ধর্ম নিরপেক্ষতা' আর বঙ্গবন্ধুর ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র ভাবনা এক নয়। আমরা যে অনিমেষ হতে চেয়েছিলাম তা আমাদের সময়োপযোগী অনিমেষ যেখানে হয়তো মাধবীলতাও গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আর পরিণত রাজনৈতিক মনগঠনে বঙ্গবন্ধু ট্রিলজি অসমাপ্ত আত্মজীবনী- কারাগারের রোজনামচা-আমার দেখা নয়া চীন খুব গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি মুদ্রিত, বেশি বিক্রিত এবং বেশি পঠিত বইয়ের নাম 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'।
১৯৯২ সাল। ঢাকা কলেজে তারুণ্যের প্রথম প্রহর কাটিয়ে ২য় প্রহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।  বঙ্গবন্ধুর আদর্শে দিন বদলের স্বপ্ন বুনি নিত্য। কয়েক দিন বা সপ্তাহের জন্য মিস হলো বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি। ভর্তির কয়েকদিন আগেই ঘোষিত হল 'লিজু-পঙ্কজ' কমিটি। নতুন উদ্যমে টিএসসি কেন্দ্র করে চষে বেড়াই গোটা ক্যাম্পাস। সকল হল, অনুষদ, ডিপার্টপেন্ট আর প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল আড্ডা, লক্ষ্য শুধু রিক্রুটমেন্টই না, সর্বস্তরে জয় বাংলার পতাকা উড়ানো। কেন্দ্রে নতুন নেতৃত্ব আসলো 'মাঈনু- ইকবাল'। দু'জনেই ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে আসায় পারফরমেন্স দেখানোর অবারিত সুযোগ আমাদের। নিত্য নতুন আইডিয়া দিয়ে পলিটিক্যাল ক্যাম্পেইনে ব্যস্ত আমি ও আমার বিশাল বন্ধু- সহযোদ্ধা গ্রুপ।
আমার তখন উদ্বাস্তু জীবন। নিজের হলে থাকতে না পারায়  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল হল (মেয়েদের হল ছাড়া), ডিএমসি'র ফজলে রাব্বি হল ও বুয়েটের সকল হলে আমার অস্থায়ী আস্তানা ছিল। তবে প্রিয় ছিল জগন্নাথ হলের উত্তর বাড়ির এক্সটেনশন টিনশেডের 'মালাউন কটেজ' (বড় করে দরজার উপরে শৈল্পিকভাবে লেখা)। ৪ সিটের রুমে ১৫/২০ থাকি, সবাই চারুকলার শুধু আমি ছাড়া। মাঝে মাঝে ২/১ টা গেস্টও নিয়ে যাই। ওটা আবাসিক কক্ষ নয়, 'সাধুসঙ্গ' বলাই শ্রেয়। জামা কাপড় থাকে জগন্নাথের লন্ড্রিতে।
মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার সুযোগ না পাওয়ার কষ্ট আমরা ভুলে যাই
১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে 'গণআদালত' আন্দোলনে অংশ নিয়ে। এর ঠিক ১ বছর পর ২৬ মার্চ, ১৯৯৩ একটা বিশালাকার দেয়াল পত্রিকা তৈরির উদ্যোগ নেই। মালাউন কটেজের সবাই দারুণ সৃষ্টিশীল শিল্পী সেই সাথে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নিভৃত যোদ্ধা। সবাই চাঁদা দিয়ে নানাবিধ নির্মাণসামগ্রী জোগাড় করে কাজে নেমে পড়লাম। টিএসসির দোতলায় স্থান সংঙ্কুলন না হওয়ায় নিচের করিডোর আর সুইমিংপুলে কাজ চলতে থাকলো। নেতৃবৃন্দ অনেকেই দেখতে আসে, অনেকে ৫০/১০০ টাকাও দিয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কালজয়ী বিভিন্ন কবিতা, কোটেশন, ফটোগ্রাফ আর নানা প্রকার ইলাস্ট্রেশনে যেটা দাঁড়ালো, তাকে ঠিক দেয়ালিকা বলা যায় না। অসাধারণ একটা মিক্সড মিডিয়া শিল্পকর্ম বলাই শ্রেয়।
কলাভবনের মূল প্রবেশদ্বারে ডিসপ্লে করবো। প্রস্থ প্রবেশদ্বারের সমান (৪০ ফুটের উপর), উচ্চতা ৫ ফুট। মিস্ত্রি দিয়ে উপরের বিমের সাথে ফিটিং করা হবে। কাজ শেষ, শুধু ইনস্টলেশন হবে। কিন্তু তখনও কোনো নাম দেয়া হয়নি। একটু ব্যতিক্রমী নাম চাই, কিন্তু মাথায়ও কিছু আসে না।
আগেই বলেছি অনিমেষ হওয়ার বাসনা সেই সময়ের আমাকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছিল। একটা দেয়ালিকার ভিন্নধর্মী নামকরণে মনের মধ্যে অনিমেষ উঁকি দেয় হুটহাট করে, আবার চলে যায়। শেষ মুহূর্তে ঘ্যাট করে থাবা দিয়ে ধরে ফেললাম, সমরেশ ট্রিলজি 'উত্তরাধিকার - কালবেলা - কালপুরুষ' একটু এদিক ওদিক করে নামকরণ করলামঃ
"কালবেলায় কালপুরুষের উত্তরাধিকার"
দেয়ালিকাটা তখন দারুণ আলোড়ন তুললো। অনেকেই দেখতে আসে। একদিন কাদের ভাইও আসলেন দেখতে। ছাত্রদলের বুঝতে একটু সময় লেগেছিল বিধায় বেশ কয়েকদিন ছিল। তারপর একদিন তারা পুড়িয়ে ফেলে। কিন্তু সবকিছু পোড়ে না। যে সমরেশের আলোয় উজ্জ্বল হয়েছে আমাদের তারুণ্য তাকে নেভানো যায় না।
বিদায় বাতিঘর।

 

Side banner