Daily Poribar
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩

হাওরে কাঁদছে কৃষক, ভুগবে বাংলাদেশ


দৈনিক পরিবার | ডেস্ক রিপোর্ট এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ০৯:২৭ এএম হাওরে কাঁদছে কৃষক, ভুগবে বাংলাদেশ

এবারের বোরো মৌসুম শুরু হয়েছিল খরা দিয়ে। আর শেষ হচ্ছে টানা বৃষ্টিতে। সেই সঙ্গে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যোগ হয়েছে পাহাড়ি ঢল। অতিবৃষ্টি ও ঢলে দেশের ধানের অন্যতম বড় উৎস ওই অঞ্চলের হাওর এখন পানির নিচে। তাই শেষ সময়ে এসে পাকা ধান আর ঘরে তুলতে পারছেন না কৃষক। এতে কৃষকের গোলা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় গোলার ধানে টান পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
হাওর এলাকার বড় অংশ পড়েছে সুনামগঞ্জ জেলায়। সেখানে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জলাবদ্ধতায় রূপ নেয় হাওর। এতে অন্তত ২০ হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে বলে দাবি কৃষকদের। তবে কৃষি অধিদপ্তর বলছে, জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান। কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার হেক্টর জমির ধান।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১২ উপজেলার ১৩৭টি হাওরে এ বছর ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুর পর্যন্ত ১ লাখ ৬ হাজার ৫২৯ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। ১ লাখ ১৬ হাজার ৯৮২ হেক্টর জমির ধান কাটা এখনো বাকি আছে। সে হিসাবে জেলার হাওরে ৫৬ ভাগ এবং নন-হাওরে (হাওরের বাইরের জমি) ১৩ ভাগসহ গড়ে ৪৭ ভাগ ধান কাটা হয়েছে।
হাওরবেষ্টিত আরেক জেলা কিশোরগঞ্জ। এই জেলার কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৮১ হেক্টর। হাওরাঞ্চলের আবাদের ৫১ শতাংশ অর্থাৎ ৫২ হাজার ৮১ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। তবে কৃষকদের দাবি, এটি ৪৫ শতাংশের বেশি হবে না। সে হিসাবে এখনো প্রায় ৬৫ শতাংশ ধান মাঠেই রয়ে গেছে।
এ ছাড়া নেত্রকোনা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ওই জেলায় ২২১৫ হেক্টর জমির ধান ঝুঁকিতে রয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এর পরিমাণ আরও বাড়বে। হাওরাঞ্চলে ৬৫ শতাংশ ধান ইতিমধ্যে কাটা শেষ হয়েছে বলে তাদের দাবি।
আর হবিগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে হবিগঞ্জে হাওর ও নন-হাওর মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে অর্ধেকের কিছু বেশি এবং নন-হাওর এলাকায় মাত্র ২০ ভাগ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। জেলার চারটি উপজেলার প্রায় ২৭১০ হেক্টর জমির ধান ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া মৌলভীবাজার কৃষি বিভাগ বলছে, জেলার হাওর এলাকায় ৮৩ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। নন-হাওর এলাকায় ১৭ শতাংশ।
এদিকে বৃষ্টির পরিস্থিতি আপাতত স্বাভাবিক হচ্ছে না উল্লেখ করে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী তিন থেকে চার দিন দেশের বেশির ভাগ এলাকায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী, এমনকি অতি ভারী বর্ষণও হতে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ প্রতীম বড়ুয়া গতকাল জানিয়েছেন, ভারতের চেরাপুঞ্জির চেয়ে দেশের ভেতরে বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় ২০-৩০ মিলিলিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
সুনামগঞ্জে অসহায় কৃষক
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হাওরাঞ্চলের মানুষের জন্য আগামী চার-পাঁচ দিন কোনো সুখবর নেই। এই কয়েক দিন সুনামগঞ্জে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনাই বেশি। ভারী বৃষ্টিতে বিপৎসীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে নদ-নদীর পানি বেড়ে বন্যা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে সুনামগঞ্জের দুই লাখ কৃষকের অধিকাংশ বোরো ধান এখনো খেতে। এর মধ্যে টানা বৃষ্টির পাশাপাশি একাধিক বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে কয়েকটি হাওর। তা ছাড়া কৃষিশ্রমিক না পাওয়ায় পাকা ধান ঘরে তোলার চেষ্টা একরকম ছেড়েই দিয়েছে লক্ষাধিক কৃষিজীবী পরিবার।
দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নের সরালীতোপা গ্রামের কৃষক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘৩০-৩৫ কিয়ার (৩০ শতকে এক কিয়ার) জমি করছিলাম। ৭ কিয়ারের মতো কাটছি। বাকি ধানের ইজাডা (ধানের শিষ) শুধু বাওয়া আছে। ধান কাটতে বেপারি পাইতাছি না। নয়ন ভাগা (অর্ধেক অর্ধেক) দিয়াও কেউ কাটতে চায় না। যেটুকু কাটছিলাম, এইডাও টালে থাইক্যা নষ্ট হইতাছে। শুকাইতে পারতাছি না।’
কৃষক মো. সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, ‘হাওরে বারো আনা ধানই কাটার বাকি। আগে ডুবরায় খাইছে, এখন যেইভাবে বৃষ্টি হইতাছে, বাকি ধান বন্যার পানিতে ডুইব্যা যাইব।’
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পলাশ ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর গ্রামের কৃষক স্বপন কুমার বর্মণ বলেন, ৩৬ কিয়ারের মধ্যে ৮-১০ কিয়ারের মতো জমির ধান কাটা হয়েছে। কাটা ধানে অঙ্কুর গজিয়ে নষ্ট হচ্ছে। শ্রমিক না থাকায় বাকি জমির ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, বৃষ্টিতে ধান কাটা যাচ্ছে না। কৃষক যতটুকু কাটতে পারছেন, তা-ও শুকাতে পারছেন না। এর মধ্যে অনেক ধানে অঙ্কুর গজিয়েছে। কৃষক ভেজা ধান যাতে অটো রাইস মিলে বিক্রি করতে পারেন, সে রকম কথাবার্তা চলছে। ভেজা ধান পলিথিন দিয়ে না ঢেকে উঁচু স্থানে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জে ধান কাটার উৎসবের বদলে বাক্রুদ্ধ কৃষক
টানা চার দিনের অতিবৃষ্টি আর আকস্মিক জলাবদ্ধতায় কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে হাহাকার নেমে এসেছে। মাঠভরা সোনালি ধান কাটার উৎসব যখন তুঙ্গে থাকার কথা, ঠিক তখনই একের পর এক হাওর তলিয়ে যাওয়ায় বাক্রুদ্ধ হয়ে পড়েছেন ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলীর হাজারো কৃষক। চোখের সামনেই তলিয়ে যাচ্ছে সারা বছরের খোরাকি ও বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল বোরো ধান।
অষ্টগ্রাম উপজেলার পূর্ব অষ্টগ্রাম ইউনিয়নের কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘জমানো টাকা আর ধারদেনা করে সাড়ে তিন একর জমি চাষ করছি। ধান বিক্রি করে ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ করব। বৃষ্টি আর পানিতে সব তলিয়ে গেছে।’
জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করছেন। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া বন্যার শঙ্কাও রয়েছে। আমরা কৃষকদের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি।’
নেত্রকোনায় তলিয়ে গেছে ২২১৫ হেক্টর জমির ধান
ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার কয়েকটি নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ পর্যন্ত ২২১৫ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। অনেক কৃষক তাঁদের একমাত্র ফসল হারিয়ে বিপাকে পড়েছেন।
মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙাপোতা হাওরপাড়ের কৃষক দোস মোহাম্মদ বলেন, ‘আট একর জমিতে বোরোধান চাষাবাদ করেছিলাম। দ্বিগুণ খরচে কিছু জমির ধান কেটে এনে বাড়িতে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। লাগাতার বৃষ্টি হওয়ায় সেগুলো পচে শেষ। বাকি জমির ধান খেতেই তলিয়ে গেছে, কেটে আনার মতো আর উপায় নেই। এমন অবস্থা প্রায় অধিকাংশ কৃষকেরই।’
ওই কৃষক আরও বলেন, একটিমাত্র ফসলের আয়ের ওপরই সারা বছরের সংসার খরচ। ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, আচার-অনুষ্ঠানসহ সবকিছুই নির্ভর করে। এবার সব শেষ।
নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, ২২১৫ হেক্টর জমির ধান ঝুঁকিতে রয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এর পরিমাণ আরও বাড়বে। হাওরাঞ্চলে ৬৫ শতাংশ ধান ইতিমধ্যে কাটা শেষ হয়েছে।
হবিগঞ্জে কাটার আগেই ডুবল পাকা ধান
হবিগঞ্জে গত মঙ্গলবার সকাল থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এতে বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, নবীগঞ্জ ও লাখাই উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরের পাকা ধান তলিয়ে গেছে।
কৃষকেরা জানান, আর কয়েক দিন পরই ধান কেটে ঘরে তোলার প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু তার আগেই আকস্মিক বন্যার পানিতে সব শেষ হয়ে গেছে।
হবিগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৪০ হাজার ৫৩২ টন। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ দীপক কুমার পাল বলেন, অবিরাম বৃষ্টি ও উজানের পানির কারণে হাওরাঞ্চলে পানি দ্রুত বাড়ছে। এতে পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে।
মৌলভীবাজারে নতুন নতুন এলাকার ধান ডুবে গেছে
জেলার কৃষকেরা জানান, মঙ্গলবার রাতেও যেসব এলাকার ধান ডোবেনি, গতকাল সকালে তা ডুবে গেছে। হাওর এলাকার কিছু কৃষক ধান কাটলেও নন-হাওর এলাকার কৃষকেরা ধান কাটতে পারেননি।
জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার কৃষক কামাল আহমেদ বলেন, ‘ধান কাটার সময় আমার এক একর জমি ডুবে গেছে। কীভাবে বছরের বাকি সময় ভাত খাব, তা বুঝতে পারছি না। শুধু আমি একা নই, আমার মতো সব কৃষকের কপাল পুড়েছে। সবাই খালি হাতে ফিরছেন। চোখের সামনে ধানখেত ডুবে গেল কিন্তু কিছুই করতে পারলাম না।’
কৃষক সজিব আহমেদ বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে ধান চাষ করেছিলাম। ৮০০ টাকা মণে ধান বিক্রি করে আগাম টাকা এনেছিলাম। এগুলো কীভাবে পরিশোধ করব, জানি না।’

Side banner