সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বাবা এস্কান্দার মজুমদারের বাড়ি ফেনী জেলার পরশুরামের শ্রীপুর গ্রামে। তবে খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে। মা তৈয়বা বেগমের জন্ম পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার চন্দনবাড়িতে। তাঁদের তিন কন্যা ও দুই পুত্রের মধ্যে খালেদা জিয়া তৃতীয়। জন্মের পর তাঁর নাম রাখা হয়েছিল খালেদা খানম। দেখতে অনেক সুন্দর ছিলেন বলে বাড়ির লোকরা তাকে ‘পুতুল’ বলে ডাকতেন। সেটিই তাঁর ডাকনাম হয়ে যায়। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন সেন্ট জোসেফ কনভেন্টে। পরে দিনাজপুর সরকারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন ও দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট (উচ্চমাধ্যমিক) উত্তীর্ণ হন।
খালেদা জিয়ার বিভিন্ন জীবনী গ্রন্থে বলা হয়েছে, শৈশব থেকেই তিনি পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকতে পছন্দ করতেন। ফুলের প্রতি ছিল তাঁর নিবিড় অনুরাগ। নিজের ঘর পরিচ্ছন্ন করে ফুল দিয়ে সাজিয়ে রাখতেন। তাঁর রাজনীতিও ছিল সৌন্দর্যমণ্ডিত।
সেনাবাহিনীর তরুণ ও চৌকস কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট দিনাজপুরের বালুবাড়িতে (পৈতৃক বাড়ি) খালেদা জিয়ার বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর থেকে খালেদা খানম ‘খালেদা জিয়া’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। জিয়া-খালেদা দম্পতির বড় ছেলে তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর জন্ম ১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট। কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়াতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে দেশের রাষ্ট্রপতি হন এবং ১৯৮১ সালের ৩০ মার্চ সেনাবাহিনীর বিপথগামী কিছু সদস্যের গুলিতে শহীদ হন। মাত্র ২১ বছরের দাম্পত্য জীবন কাটিয়ে ৩৬ বছর বয়সে খালেদা জিয়া স্বামী হারান। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবন। দলীয় শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব সমুন্নত রাখার পাশাপাশি এরশাদের স্বৈরশাসনবিরোধী গণ-আন্দোলনের ভেতর দিয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তিনি ভাইস চেয়ারপারসন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের পর বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের ৪১ বছরই তিনি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির শীর্ষ নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে গঠিত হয়েছিল সাতদলীয় ঐক্যজোট। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতির কাছে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণ করে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় আপসহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিজয়ী হয়। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে শপথ নেন। তিনি ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয় এবং ২০০১ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া ১৯৯৬ সালে ও ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দেন। খালেদা জিয়া ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত মোট ২৩টি সংসদীয় আসনে নির্বাচন করেছেন। কোনোটিতেই তিনি পরাজিত হননি। তাঁর এক জীবনীকার বলেছেন, খালেদা জিয়া পরিশ্রমসাধ্য দীর্ঘ সফর করতে পারঙ্গম ছিলেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের ১৪ দিন আগে তিনি সারা দেশে প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করেছিলেন।
খালেদা জিয়া জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও নির্যাতনের শিকার হন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ২ জুলাই থেকে যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সেনানিবাসে বন্দি ছিলেন। জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর ১৯৮১ সালে সেনানিবাসের বাড়িতে তাঁকে কিছুদিন গৃহবন্দি রাখা হয়েছিল। ‘ওয়ান-ইলেভেন’ সরকারের সময়ে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল সড়কের বাড়িতে গৃহবন্দি করা হয়। দুর্নীতির দুই মামলায় সাজা দিয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে পাঠানো হয় তাঁকে। তখন দুই বছরের বেশি সময় কারাগারে বন্দি ছিলেন সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ তৎকালীন সরকারের নির্বাহী আদেশে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। এই সময়ে নানাবিধ রোগের জটিলতা এবং শরীর ও মনে বহু ধকল সহ্য করে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন তিনি। গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে শেষবারের মতো ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এরপর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেশবাসীকে কাঁদিয়ে চিরবিদায় নেন খালেদা জিয়া।








































আপনার মতামত লিখুন :